অনুরণন

চারু-লতা ( শেষ পর্ব)

 

হিমেল আর চারুর মাঝে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। লতার পায়ের নিচে মাটি সরে যাবারই কথা। তাছাড়া লতাকে কিই বা জবাব দিবে হিমেল! মানুষের জীবনে কখন কি হয় তা মানুষ আগে বলতে পারে না। পারলে হয়তো লতা হিমেলকে গ্রামে যেতে দিত না। হিমেলেরই বা দোষ কিসে! চারু তো তার প্রথম স্ত্রী। হয়তো ভালবেসেছে পরে। তাই বলে লতা কে তো সে অবহেলা করছে না। দু স্ত্রীই তার ভালবাসা পাবার সমান অংশীদার। এতো দিন তো সে অন্যায় করেছে চারুর সাথে। তার প্রাপ্য থেকে তাকে বঞ্চিত করেছে। এখন সেটা হিসেব মিলানোর পালা।

চারু কিন্তু বেশ বুঝতে পারছে লতা সব দেখছে। কিন্তু তার আর হিমেলের সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করছে লতা। হয়তো ও মেনে নিয়েছে সব। তাছাড়া এসব তো তারই হবার কথা ছিল। বিয়ের সময় বয়স ছিল তের। এখন সে যুবতী। লতার তো অনেক বয়স। আর পুরুষ মানুষেরর এক নারীতে কত দিন ভাল লাগে! আর চারু তো বাইরের কেউ না। সুতরাং কোন অন্যায় করা হচ্ছে না। বাধা দিলে ভুল হবে লতারই। আর তাও বেশি সমস্যা করলে চারু দুকথা শুনিয়ে দিবে। এতো দিন তো একাই সব কিছু ভোগ করেছে। সে পড়ে ছিল গ্রামে, ওই নোংরা পরিবেশে। আর শহরে এতো আরাম আর দামী পোশাক পড়েছে। আর সে সব কিছুতেই বঞ্চিত।

আধুনিকতার ছোয়ায় চারু যেমন বাইরে পরিবর্তন হলো, তেমনি ভেতরেও। আগের মত আর লতাকে সে সময় দেয় না। লতাও আর তেমন চারুকে ডাকে না। এখন প্রায়ই স্বামীর কাছে বায়না করে ঘুরতে যাবার। হিমেলও নিয়ে যায়। দুই একবার লতা সাথে গেলেও, পরে যাওয়া বন্ধ করে দিল। লতা বুঝতে পারে চারু চায় না সে যাক। ছেলেও এখন আর চারুর আদরমাখা ভাত খেতে পারে না। তার চারু মা আর আগের মত নেই।

মায়াবী মানুষ যখন মায়া হারাতে থাকে তখন তার মুখেও রুক্ষতাকে প্রকাশ পায়। অন্যের প্রতি ভালবাসা ভুলে হয়ে উঠে স্বার্থপর। লতাকে এখন আর সহ্য হচ্ছে না তার। লতার জন্যই এইসব কিছুকে নিজের করে নিতে পারছে না চারু। নইলে গ্রামে এতোদিন তাকে কষ্ট পেতে হতো না। এখন চারুর দিন রাতের স্বপ্ন লতাবিহীন সংসার। ছেলেটা যেহেতু হিমেলেরই তো ফেলবে না তাকে।

চারু আসার তিন মাসের মধ্যেই নতুন সুসংবাদ পেলেন দেওয়ান সাহেব। চারু মা হবে। এতোদিনে তবে তার মনে শান্তি হলো। ছেলে আর লতা চারুকে মেনে নিয়েছে। লতা সাহসী মেয়ে না হলে কি সতীনকে ঘরে তুলে নেয়! ওরা তিনজন ভাল থাকুক এটাই প্রার্থনা।

তবে বাস্তব দৃশ্যপট একেবারেই আলাদা। ঘরময় থমথমে ভাব আর মানবী’দ্বয়ের মনে প্রবল ঝড়। লতা আর চারুতে ডুবে থাকা হিমেল মূল ব্যাপারটা বুঝার আগেই দুজনেই দারুণ অভিনয়ে জানিয়ে দিচ্ছিল উলটো কথা। ঘরে আসতেই দুজনেই যত্ন করছে স্বামীর। তবে কাজের ভার কিছুটা চারুর উপর বেশি। ভারটা কিছুটা নিজেই কাধেঁ নেয়া আর বেশির ভাগটা লতার উদাসীনতা অথবা ইচ্ছাকৃত।

ইতিমধ্যে চারুর নিজের মায়ের কথা স্মরণ হল। নতুন অতিথি যেহেতু ঢাকার কোন ভাল হাসপাতালে আসবে তাহলে এখনই মোক্ষম সময় একবার ঘুরে আসা। এবার অন্য কেউ না, হিমেলকেই বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে চারুকে। তবে লতাকে একা রেখে যেতে রাজি নয় হিমেল। চারুর মনের বিরক্তিটা নানা রকম ব্যবহারে লতার চোখ এড়ায়নি। অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও হিমেল রাজি হল না। শেষ পর্যন্ত চারুর বাজে অঙ্গ-ভঙ্গিকে সহ্য করেই রওনা হল ট্রেনে।

ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিল লতা। তবে দেখাটা ঠিক গাছপালা আর পাহাড়কে না। নিজের জীবনের নানা দৃশ্যগুলো একে একে গাছের মত দ্রুত চলে যাচ্ছে পেছনে। আর সামনের দিকে যেন অজানা অদেখা অনেকগুলো মুখ।

ছেলেটা একবার বাবার কাছে যাচ্ছে আবার চারুর কাছে। হিমেলের সামনে অভিনয়টা চারু ভালই করে। যেন আপন মায়ের চেয়েও বেশি। এই বেশি বেশি ভাবটাই দারুনভাবে বুকে বিধছিল লতার। তাও সে দিকে নজর কমই তার। হিমেল এখন চারুকেই বেশি ভালবাসে। ভালবাসাটা সে মেনে নিতে পারতো হয়তো যদি না চারু এভাবে নিজেকে স্বার্থপর করে তুলতো। আজ যদি পরিকল্পনা মাফিক কাজটা হয়ে যায় তাহলে ভালই হয়।

পরিকল্পনা! হুম একটা পরিকল্পনা লতার মনে বেশ কয়েকদিনের। এতো অপমান সহ্য হচ্ছিল না। যে চারুকে সে নিজের ঘরে এনেছিল সেই আজ তার এতো বড় ক্ষতি করলো। চারু না হয় পর মানুষ আর বড় কথা সে সতীন। তাই বলে হিমেল এমনটা করলো কি করে! তার কাছে সে এটা আশা করেনি। চারুর প্রতি মনযোগ লতাকে চরম অপমানিত করেছে। চারুর কাছে ছোট হতে হয়েছে। বিয়ের রাতে বলেছিল চারু তার জীবনে কিছু না। লতাই তার অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। তাহলে আজ কেন এতো পরিবর্তন। তাহলে কি জগতে কেউ বিশ্বাস যোগ্য নয়?

তাহলে শুধু একা বিশ্বাসী থেকে কি লাভ। স্বামীকে তো কিছু করা যাবে না। তাহলে সব নষ্টের মূলটাকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া যাক।

যেই ভাবা সেই কাজ। ট্রেনে আসার সময় বাসা থেকে খিচুরী রান্না করে এনেছে চারু। হটপটের ছোট চার বাটিতে খিচুরী নিয়ে নিল। হটপটে না সাজিয়ে রেখেই রান্না ঘর থেকে নিজের ঘরে গেল। এসে প্যাক করবে। এর মাঝে সুযোগ বুঝে আগের দিনে এনে রাখা বিষ লতা ঢেলে দিল একবাটিতে। নিজের রুমে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়লো কোন বাটিতে বিষ ঢেলেছে তার একটা দাগ রেখে আসা উচিত ছিল। গিয়ে দেখলো সেখানে হিমেলসহ চারু। লতা কিছু করতে পারলো না। তবে যে বাটিটাতে সে বিষ দিয়েছিল তা সে চিনে রাখলো। লতার দিকে একটা পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল

– আপুমণি, এই পানিটা তুমি খাবে। ব্যাগে নিয়ে নাও।

লতা বেশ টেনশনে পড়ে গেল। কাজটা ঠিকমত হবে তো। অবশ্যই হবে। কারণ বিষ দেয়া বাটিটা যেন চারুই খায় সেটা সে নিজেই নিশ্চিত করবে। তবে বাটি টা যে বাসাতেই অলট পালট হয়েছে তা লতা জানতে পারেনি। লতা জানতো দ্বিতীয় বাটিতে বিষ। কিন্তু চারু ডিম রাখার জন্য একবাটির খিচুরী খালি করে ওটাতে ডিম নিয়ে নিল। আর রেখে দেয়া খিচুরী অন্যবাটিগুলোতে যেটুকু পারলো নিয়ে বাকিটুকু নিজে খেয়ে নিল। আর এতে করে বিষের বাটি সবার নিচে চলে গেল।

সবাইকে খাবার দেয়ার সময় ডিমের বাটি দেখে লতা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। চারুর দেয়া খিচুরীর বাটিটা হাতে নিয়ে সে চুপচাপ বসে রইলো। সিটের সামনে ছোট টেবিলের মত জায়গাটাতে খিচুরীটা রেখে দিয়ে সে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো। আস্তে করে নিজের কাছে থাকা পানিটা হাতে নিল খাবার জন্য। তার আগেই হঠাৎ হিমেল কাশি দিয়ে উঠলো খিচুরী খাবার সময়। চমকে উঠলো দুজনই। নিজের হাতে পানিটা এগিয়ে দিতেই চারু বলে উঠলো,

– ওটা তোমার। ওর জন্য আমি পানি এনেছি।

বেশ শুদ্ধ কথা বলা শুরু করেছে চারু। আজ একটা উচিৎ শিক্ষা হবে। কিন্তু কোন বাটিটাতে সে বিষ দিয়েছিল? তবে দ্বিতীয় বাটিটাতে যেটাতে বিষ দিয়েছিল সেটা চারুর হাতে। ওর দিকে এগিয়ে দেয়া তৃতীয় বাটিটা এখন নিজের সামনে। তাহলে শেষ বাটিটা হিমেলের কাছে!

ছেলেকে খাইয়ে নিজে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বলা যায় না চারুর দেয়া বাটিতেই যদি বিষটা থাকে। কিন্তু ওদিকে সবার অগোচরে বিষটা খেয়ে নিচ্ছিল হিমেল।

আবার কাশি শুরু হল হিমেলের। বাড়ছেই কাশি। কাশতে কাশতে মুখ থেকে রক্ত! আশেপাশের সবাই দৌড়ে এলো। চারু আর লতা উদ্ভ্রান্তের মত করতে লাগলো। লতা কি করলো এটা! শেষ পর্যন্ত হিমেলকেই সে….।

পুলিশ সব তদন্ত করে দেখলো বিষের অস্তিত্ব শুধু হিমেলের খিচুরীতে না। লতার বাটি আর চারুর দেয়া পানিতেও পাওয়া গেছে। তবে বিষ দুটি আলাদা ছিল। কিন্তু সেই দিকে আর তদন্ত হল না। চারুই যে  হিমেল ও লতাকে খিচুরী এবং পানি দিয়েছিল তা প্রমাণিত হল। চারু আর ভাবতে পারেনি অন্য বিষটা চারুই দিয়েছে। কারন দুধওয়ালা তো তাকে ছোট দুই শিশি বিষ এনে দিয়েছিল। দুটো থেকেই অল্প করে সে খিচুরী আর পানিতে মিশিয়েছিল….।

…..আজ দশ বছর হতে চললো সেই ঘটনার। লতা গ্রামে দেওয়ান সাহেবের সাথে থাকে। নিজের ডায়রীতে আজ যত কথা শুধু চারুকে নিয়েই। রাত হলেই সেদিনগুলোর কথা লিখে রাখে যেদিনগুলোতে চারু ওর গল্পের সঙ্গী ছিল। ভালবাসা মানুষকে হিংশুটে করে দেয়। বিশেষ করে নারীর মনকে।

চারুও যে লতাকে মারার পরিকল্পনায় ছিল তা জানতে পারেনি লতা। তবে অন্যায় হলেও সমস্ত ব্যাপারগুলো থেকে রক্ষা পেল লতা। হয়তো সেদিন লতা নিজের অপরাধটুকু স্বীকার করে নিতে পারতো। কিন্তু নিজের ছেলের কথা ভেবে নিজে ভাল সেজে থাকলো। সে আছে বলেই চারুর নয় বছরের মেয়েটি আজ নিজের মাকে পেয়েছে। চারু হয়তো এখনও জেলে। জানে কেউ। হয়তো ফাঁসি হয়েছে। এতো বছরে কেউ চারুকে দেখেনি…।

(সমাপ্ত)

লিখেছেনঃ আনিকা ইসলাম
চারুলতার অন্যান্য পর্ব পড়ুনঃ হুতুমপেঁচা -তে।