অনুরণন

চারু-লতা (পর্ব- ৪)

এবারের গ্রামে যাওয়াটা অন্যবারের তুলনায় একটু অন্যরকম ছিল লতা আর হিমেলের। আর গ্রাম থেকে আসার পর থেকে হিমেলকে বেশ অগোছালো আর অমনোযোগী মনে হচ্ছে। কি হয়েছে জানার আগ্রহ থাকলেও হিমেলকে জিগ্যেস করতে মন সায় দেয় না লতার।

মনে বড় ভয় হিমেল কি তবে চারুকে ভাবছে? না তা হবে কেন! হিমেল তো কখনও চারুকে ভালবাসে নি। বিয়েটা ছিল একেবারে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত। মেঘ নেমে এসেছিল তিনটে জীবনে। তবে এতো দিন মেঘটা কেমন ভয়ানক তা বুঝতে পারেনি লতা। ইদানিং খুব বেশি রকমের মনঃকষ্টে ভুগছে সে। হিমেলের এখনকার উদসীনতা ওকে গ্রাস করে ফেলছে।

দিন যত যায় লতার ভাবনার দুনিয়া ততো বেশি প্রসারিত হতে শুরু করলো। ভাবতে ভাবতে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লো লতা। কি হলো ঠিক বুঝতে পারছে না হিমেল। প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে লতা ক্লান্ত আর হিমেল উপযুক্ত উত্তরের আশায় ক্লান্ত। এমন অবস্থায় ছেলের কোন যত্ন নিতে পারছে না। মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফিরে দেখে ছেলেটা না খেয়ে ঘুমিয়ে। আর লতা ব্যপারটা জানতোই না।

হিমেল বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। বাবাকে ফোন দেবার পর দেওয়ান সাহেবের পরামর্শ হল ডাক্তার দেখানো। হিমেলের বড় চিন্তা ছেলেটা। এমনিতেই কেন যেন মন বেশ বিক্ষিপ্ত। মনের মাঝে কেন যেন একটা শুণ্যতা ওকে কষ্ট দিচ্ছে। কারনটা জানা নেই।

– হিমেল। হিমেল।

পাশের রুম থেকে লতার ডাকে হিমেল কাছে গেল। লতা নিচু সরে বুঝিয়ে দিল যে সে চারুকে দেখতে চায়। তার ভাল লাগছে না।

চারুর কথা উঠতেই হিমেলের বুক হঠাৎ কেঁপে উঠলো। তার চাইতে অবাক করা ব্যাপার হলো লতা চারুর কথা বলছে! চারুর সাথে কখনই লতাকে কথা বলতে দেখেনি সে। চারুর ব্যাপারে সব সময়ই যে কোন আলোচনার বাইরে ছিল দুজন। কিন্তু তবে কেন লতার আজ চারুকেই লাগবে!

– চারু কেন? রহিমের মা কে বলি। তাছাড়া চাচী তো আমাদের বেবি হবার সময়ও ছিল।

– না। চারু আসুক।

বলেই অন্য দিকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো। হিমেলের প্রায় কেঁদে দেয়া অবস্থা। লতা বরাবর স্বামী সন্তানের প্রতি বেশ যত্নশীল। কিন্তু কয়দিনে হারিয়ে যাওয়া লতাকে অচেনা মনে হচ্ছে। বাড়িতে জানানো হল। চারুকে কালই পাঠিয়ে দিবে।

সব কিছুর বাইরে মূল কথা হল চারু আসবে ব্যাপারটিতে অসম্ভব রকমে উত্তেজনা বোধ করছে হিমেল। কেন যেন অন্যরকম একটা ভাল লাগা কাজ করছে। আবার বেশ সন্দেহে আছে লতাকে নিয়ে। সারাদিন ঘরময় পায়চারি করতে লাগলো। মনে হতে লাগলো এমন কেউ আসছে যার জন্য সে বহুদিন যাবত অপেক্ষা করে আছে। মনের মাঝে দক্ষিনের হাওয়ার ঝাপটায় চল্লিশ বসন্তকে ভুলিয়ে দিয়ে পচিঁশ বছরের উদ্দাম আকর্ষণ যেন।

চারুর জন্য এখম ভাবনাটাও বেশ পীড়া দিতে লাগলো মনে। তবুও অপেক্ষা কখন বিকেল হবে আর কখন সবচাইতে অনাকাঙ্ক্ষিত মানবীর দেখা পাবে। তের বছর আগে যখন চারু তার ঘরে এসেছিল তাকে নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবার মানসিক অবস্থা ছিল না তার। ঘর আলো করে প্রথম আসার কথা ছিল লতার মত সজীব আর চটপটে শহুরে মেয়ের। কিন্তু হিমেলের বহুদিনের পরিচিত সেদিনের কক্ষটিকে অন্ধকার করে নিজের অস্তিত্বকে জানান দিয়েছিল চারু। কোথায় এই গ্রাম্য অর্ধশিক্ষত চারু, আর কোথায় ছয় বছরের সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা লতা। বৃদ্ধের সিদ্ধান্তে তিন তিনটে জীবনের ভাবধারা একেবারে পাল্টে গেল চরম অনিশ্চয়তায়।

হিমেলের কখনই সুযোগ হয়নি চারুকে নিয়ে ভাববার। যত চিন্তা ছিল সবটাই ছিল লতাকে ঘিরে। এমনকি যেদিন বিয়ের দুমাস পর লতাকে নিয়ে প্রথম গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল সেদিনও চারুর খবর নেয়নি হিমেল। আজ কেন তবে মনের মাঝে উত্তাল হাওয়া বইছে। মনে হচ্ছে হঠাৎ করেই সব কিছু! না তা নয়। সেবার সবার চোখের অন্তরালে চারুকে সে খুব কাছে থেকে পেয়েছিল হয়তো কারনটা সেখানেই নিহিত। লতা কি জেনেছিল বৃষ্টির মাঝে তার চলে যাবার পথকে চারু ছাড়াও আরো একজন অনুসরণ করেছিল সেদিন! নীরবে নিবৃত্তে প্রথমবারের মত চারুকে প্রথম দেখেছিল।

চারু আসার পর বেশ ভাল কাটছিল দিনগুলো। চারু এখন পুরো সংসারের দায়িত্বে। লতার ছেলে চারুকে আগে থেকেই ছোট মা বলে ডাকে। অফিস যাবার আগে নাস্তা তৈরি করে দিচ্ছে চারু হিমেলের জন্য। প্রথম প্রথম শহুরে জীবন বেশ ঝামেলার ছিল। পরে সে ভালভাবেই মানিয়ে নিয়েছে। লতার সংসারে এখন সে কর্ত্রী। গুছানো সংসারকে সে আরো গুছিয়ে নিলো। আর লতাও চারুকে তার সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিত মনে সারাদিন নিজের ঘরে থাকে।

হিমেলও গত কয় মাসের নীরবতা ভেঙ্গে এখন বেশ চনমনে। ঠিক সময় মত খাওয়া দাওয়া, হাসিখুশি মুখ ফিরে আসতে শুরু করেছে। চারুও কম কিসে। দারূন খুশিমনে সে সব করছে। লতার খুব যত্ন করছে। দুজনের মাঝে দূরত্ব দূর হয়ে যেতে লাগলো। গভীর রাত অবধী এখন দুজন কথা বলে কাটিয়ে দেয়। এর মাঝে কখনও কখনও চারুর কাছে বিদায় নিয়ে শুতে চলে যায়। তবে চারু কখনই এটি করেনি। দুজন যেন এক আত্মা হয়ে একসঙ্গে বসে তারা গুনতে লাগলো।

এখন লতার আর হিমেলকে প্রয়োজন হয় না সময় কাটানোর জন্য। চারুই তার সব সময়ের সঙ্গী। গভীর রাত অবধি চলতে থাকে তাদের মেঘ নিয়ে গবেষনা। দুজনে মেঘের নাম দিল কাজলরেখা। যত বেশি কালো মেঘ তা যেন চারু। আর শেষ সীমানায় রেখা টেনে চারু বলল, এটা তুমি আপুমণি।

(চলবে…..)

লিখেছেনঃ আনিকা ইসলাম
চারুলতার অন্যান্য পর্ব পড়ুনঃ হুতুমপেঁচা -তে।