অনুরণন

অপ্রাপ্তি

সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে গেলো, জানালার পর্দা সরিয়ে ফেলতেই চোখ পড়লো গ্রিলে বসে থাকা পাখি দুটির দিকে। পাশাপাশি বসে আছে, হালকা রোদের আভা এসে পড়েছে ওদের গায়ে। সারাদিনের ছোটাছুটি শুরু হবে তাই হয়তোবা জুড়িয়ে নিচ্ছে । ওদের কি মান-অভিমান হয়? ওদের অনুভূতি গুলো কেমন, ওদের ও কি কষ্টগুলো এমনই তীব্র? জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কখন যে চোখ থেকে পানি গরিয়ে গালে পৌঁছেছে সেটা শুভ না বললে হয়তবা রুমকি বুঝতেই পারতো না। এতোটায় আনমনে ছিলো সে।

কি হয়েছে রুমকি ? কেনো মন খারাপ? বাড়ির কথা মনে পড়েছে?ঠিক এভাবেই বুঝে শুভ রুমকিকে। সত্যিই তো খুব মনে পড়ছে বাবা-মার কথা। কতদিন দেখেনি। বিয়ের পর কি করে বলবে এসব তাই বলা হয়নি। শুভর পরদিন অফিস শেষ করে ঠিকই নিয়ে গিয়েছিলো বাবার বাড়ি। কথা দিয়েছিলো প্রতি সপ্তাহের শেষে ওকে বাবা- মার সাথে দেখা করাতে নিয়ে যাবে। কথা রেখেছিলো সে। রাতে বাড়ি ফেরার পর কথার ঝুড়ি নিয়ে বসতো শুভ। রুমকির বলতে ভাল লাগতো না, তবে শুনতো মন দিয়ে। সারা দিনের যত কথা সব বলতো শুভ, আর রুমকি শুধু শুনতো। ছুটির দিনে দুজন ঘুরতে বের হতো, ঘুরতে রুমকির বেশ লাগতো তবে এখন আর সেভাবে মন লাগেনা কিছুতেই। আনমনে বসে ভাবনাতেই দিন চলে যায়। তবে একটু একটু করে সহজ হচ্ছে দুজনের সম্পর্ক।

মাঝে মাঝে একই স্বপ্ন রুমকি দেখে সাব্বির হাত বাড়িয়ে আছে ওর দিকে, রুমকি হাতটা ধরার আগেই সাব্বির হাতটা ফিরিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। কষ্টে চিৎকার করে উঠতেই ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। তারপর সারাটা রাত নির্ঘুম কেটে যায়।কলেজে অনেক বন্ধু ছিলো, সবার সাথে মজার সময় কাটতো। আড্ডা আর আড্ডা। একজন না এলে বাকিরাও বসে থাকতো এলে তবে আড্ডা শুরু। মাঝে মাঝে সবাই মিলে কোন একজনের বাসায় আড্ডা খাইদাই। মজার সময় পার করেছে ওরা। সবার মাঝেই ছিলো সাব্বির, একসময় মনে হতে শুরু করলো ওকে না দেখলে দিনটা অনেক বড় মনে হয়, কিছুই যেনো ভাল লাগেনা। সম্পর্কটা বাড়তে থাকে, পড়াটা শেষ হওয়ার আগেই দুজনের ছেলেমানুষির ফল একা রুমকিকে ভোগ করতে হলো। সাব্বির কোন দায়িত্ব নিতে নারাজ, শেষ মুহূত্বে রুমকি সিদ্ধান্ত নেয় সাব্বির যদি না নেয় তাহলে সেও দায়িত্ব নিবে না। দুজনের সম্পর্ক শেষ করতে হয় সেদিন। কখনও সাব্বির খবর নেয়নি রুমকির। দিনগুলি একাকী কাটতে থাকে। কত ভাবনা, কত মিষ্টি অনুভূতি একাকী অনুভব করে সে। তারপরও নিজেকে কঠিন হতে হচ্ছে। খুব অসুস্থ বোধ করছিলো সেদিন, শীলা তাকে নিয়ে আসে ক্লিনিকে, খুব ভোরে শীলা আর রুমকি সদ্য জন্ম নেওয়া, ছোট্ট নরম তুলতুলে শরীরের মানুষটাকে একা ক্লিনিকে ফেলে ফিরে আসে। আসবার সময় শুধু বলে এসেছিলো তুই যেখানেই থাকিস না কেনো তোর মা প্রতি সপ্তাহে একবার তোকে দেখতে যাবে। তাই দুদিন পর তার এক বন্ধুকে পাঠিয়ে জানতে পারে ছেলের ঠিকানা, কিছুটা মন শান্ত হয়েছিলো সেদিন।

হঠাৎ করেই বিয়েটা ঠিক করে ফেলে বাড়ি থেকে, শুভোর সাথে, কিন্তু রুমকি কি করে এসব গোপন করবে, সে চায়না এসব গোপন করে বিয়ে করতে। তাই শুভকে ডেকে বলে ভাইয়া তোমাকে কিছু কথা বলা এবং তোমার জানা খুব দরকার। শুভ থামিয়ে দেয় রুমকি কে।

শুভ: আমি সব জানি, জেনেই তোকে বিয়ে করতে চাই।
রুমকি: তুমি জানো হয়তো সাব্বিরের কথা, কিন্তু আমার জীবনের আরও অনেকটা তুমি জানো না।
শুভ : Congratulations মা হওয়ার জন্য
রুমকি: তুমি জানো? তাহলে জেনে ও কেনো চুপ করে আছো? কেনো আমাকে কিছু বলোনি?
শুভ : চুপ করে নেই তো, তোকে বিয়ে করবো বলেছিতো। আর ছেলেকে আমাদের মতো করে আমরা বড় করবো।

রুমকি সেদিন আর কিছু বলতে পারেনি। কি হতে পারে এর উত্তর সেটা রুমকির জানা নেই। কদিনের মধ্যেই ওদের বিয়ে হয়ে যায়। এবার ছেলেকে নিজের কাছে নিবার সব ব্যাবস্থা করতে হবে। অনেক কেনাকাটা করেছে ছেলের জন্য। বেশ কিছুদিন হয় ছেলেটাকে দেখেনি রুমকি , এবার নিতে যাবে, খুব মনটা ভাল তাই। জানিস বাবা তুই যখন তোর মা’র শরীরে তখন কত কিছু ভাবতাম, কার মতো হবে দেখতে, হাত পা গুলো কেমন হবে। তোর প্রথম নড়া আমাকে আনন্দে আত্মহারা করে দিয়েছিলো। তোকে নিয়ে কত স্বপ্ন বুনেছিলাম, কিন্তু পুরন হয়নি কত কিছু, তোকে ছুঁয়ে দেখতে পারিনি, বুকে নিতে পারিনি, এবার তোকে নিয়ে সব স্বপ্ন পুরন করবো, আর কটাদিন তারপর তোর আর আমার মনে কোন কষ্ট থাকবেনা।

রুমকি পানিতে হাত দিয়ে পানি সহ পোনা গুলোকে তুলছে আবার ছাড়ছে, আবার তুলছে। এতো এতো মাছের পোনা একসাথে ঘুরছে দেখতেই ভাললাগছে তার। শুভ ভাইয়া যাবার সময় দেখে রুমকি এসব নিয়ে ব্যস্ত। রুমকি শুভকে দেখেই চিৎকার করে উঠলো। ভাইয়া দেখো কত্তো মাছের পোনা। শুভ মুখ বাঁকিয়ে বলে ছি এগুলা তো ব্যাঙ্গের ছা । ওয়াক, বলে এক লাফে উপরে উঠে আসে রুমকি। কি বলো ভাইয়া? ঠিকই তো, আরে দেখ কেমন পেট মোটা আর নিচের দিকে কেমন। দেখ তোর হাতে এবার কি হয়, বলেই সে হাটতে শুরু করে, খুব রাগ হয় রুমকির রাগ নিয়েই শুভর চলে যাওয়া দেখতে থাকে। রাতে সবাই মিলে বসে গল্প করছে, ভূতের গল্প। যখনই খালার বাসায় বেড়াতে আসে তখন চিন্তা থাকে এত্তো এত্তো ভূতের গল্প শুনবে, শুনে ভয় পেয়ে একা ঘুরতে সাহস হয়না তবুও শুনবে।আর শুভ ভাইয়ার চেষ্টা থাকে আরো কি করে ভয় দেখানো যায়। আজ তোকে দেখতে এসে হঠাৎ মনে পরে গেলো সেই ছোটবেলার দিন গুলি। রুমকি সপ্তাহে একদিন এখানে আসবেই, আসতে ইচ্ছে করে, নিজের ভূল তাকে এখানে টেনে আনে। কত না বলা কথা বলে যায় এখানে এসে। রুমকি ভাবে, কোন কথা তো তোকে বলতে পারিনি, যখন তোকে নিতে গেলাম তখন তো তুই তোর মার উপর অভিমান করে চলে গেছিস। তোকে নিয়ে ঠিকই এসেছি তবে তোর জন্য খেলনায় সাজানো ঘরে নয়, সেই পুরোনো পুকুর পাড়ে শুভর প্রিয় বকুল গাছটার নিচে।

 
লেখিকার আরো অন্যান্য লেখা পড়ুনঃ হুতুমপেঁচা ম্যাগাজিন -এ।