অনুরণন

চারু-লতা (পর্ব-৩)

আকাশের কালো মেঘ দুপুর থেকে সূর্যকে আড়াল করেছে। ঘরের টুকিটাকি কাজগুলো সেরে নিচ্ছিল লতা। মেঘ করলেই লতার কান্না পেতে থাকে। মনের অজান্তে চোখের কোণে জমে থাকা পানি কখনও তার চিবুকের ছোঁয়া পায় নি।
দেওয়ান সাহেব সকাল থেকে রহিমের সাথে রেগে আছেন। চারু শেষ পর্যন্ত ওনাকে শান্ত করতে সফল হলো। অবাক করা ধৈর্যশীল মেয়ে। গলার শব্দ এতটাই ক্ষীণ যে অনেক সময় পাশের মানুষটিও বুঝে না কি বলল। সদা মাথায় ঘোমটা দিয়ে বাড়িময় ঘুরতে থাকে।
ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। প্রায় সন্ধ্যা নাগাদ বৃষ্টি ক্লান্ত হলো। ঘরের কোণে পানি জমে গেল। মেঘ আর পড়ন্ত বিকেলের লাল আভায় চারপাশটা বেশ মায়াবী ঠেকলো লতার। এমন সময় চুরির হালকা রিনিঝিনি শব্দ। নীরবে দাড়িয়ে চারু ছাড়া আর কেউ না।
– আপুমণি, চা নিয়া আসছি।
বারান্দার ছোট টেবিলটায় চা রেখেই দাড়িয়ে রইলো। ঘরের কোণে ফুলের বাগানটাকে দেখিয়ে বললো,
– চারু বাগানটা সুন্দর করেছো। খুব যত্ন নাও বোঝা যায়।
প্রশ্ন শুনেই অবাক হয়ে গেল চারু। লতা তো তার সাথে কথা বলে না খুব প্রয়োজন ছাড়া।
– আপুমণি, রহিম বেশি দেহাশুনা করে।
লতা চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। চুপ করে থাকতে দেখে ধীর পায়ে পিচ্ছিল মাটি পেড়িয়ে বাগানে ঠুকে একটা গোলাপ ছিঁড়ে নিয়ে আসলো চারু। ফুলটা লতার দিকে বাড়িয়ে দিতেই মনের অজান্তে ফুলটা হাতে তুলে নিল লতা। বেশ খুশি হয়ে গেল চারু।
তারপর সে বাড়ির উঠোনের শেষ প্রান্তে গরুর ঘরের সামনে অসাবধানতারর দরুন পিছলে পড়ে গেল। ওতো ব্যথা নয় পেলেও সব কাপড় নোংরা হয়ে গেল। আর সাথে সাথে আবার বৃষ্টি। ধীরে সুস্থে চারু দাড়ালো। কাপড় পরিস্কার করা এখন প্রধান কাজ। বাড়ির ভেতরে বেশ বড় পুকুর।
আস্তে আস্তে লতাও পুকুরের দিকে যেতে লাগলো। কোন খেয়াল নাই কেন সে চারুর পিছু নিল। এটা তো কোন ভাবেই হবার কথা ছিল না। আজ চারুর মায়াবী আকর্ষণে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে কাপড় ভিজে যাবার ব্যপারটা আর গায়ে মাখছে না লতা। রূঢ় সত্যিটা হল চারু তার স্বামীর কাঁধে ঝুলে পড়া অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণী। তার স্বামীর ভাগ বসাতে পারে যে কোন সময়ে।
আজ কেন যেন গ্রামের এই অর্ধশিক্ষিত মেয়েকে ভয় ভয় করছে তার। মৃদু সাবধান পদক্ষেপে পুকুরপাড়ে যেয়ে দেখলো চারু পা ডুবিয়ে দূর কিছু একটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। মাথার কাপড় কাঁধে ফেলে চুপচাপ ভিজে যাচ্ছে। খুব ধীর পায়ে লতাও নামলো ঘাটের শিড়ি বেয়ে। চারু মনে হল হারিয়ে গেছে। শরীর পুরো ভিজে গেছে দুজনেরই। লতা কিছুক্ষনের মধ্যেই দেখলো বা পাশের চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে বাম গাল বেয়ে গড়িয়ে গেল। বুকের মাঝে মোচর দিয়ে উঠলো লতার। চাপা কান্নায় বুকটা ভারী হয়ে গেল লতার।
কাঁদছে চারু। অঝরে! টপ টপ করে মিশে যাচ্ছে বৃষ্টির সাথে। একটু পর পর চোখ মুছে হাত দিয়ে। লতা চোখের জল নেই। বের হতে পারছে না। আটকে আছে চোখের কোটরে। কেন কাঁদতে পারছে না? হয়তো অভ্যাস নেই। হয়তো বুঝতে পারছে না কি ঘটে যাচ্ছে। চারু যে কিনা এক কথায় তার সতীন, তার চোখের জলে ভেসে যাওয়াটা বড় শূন্যতা সৃষ্টি করছে মনের ভেতর।
চারুর কোন হুশ নেই লতা তার পাশে দাড়িয়ে তার লুকিয়ে রাখা কষ্টটুকু দেখছে। হয়তো এই প্রথমবারের মত লতা বুঝেছে, এই মেয়েটি অনুভূতিহীন নয়। যাকে গত সাত আট বছরে ঠিক নজরে দেখেনি লতা। প্রথম দেখাতেই এভাবে হৃদয় কেঁপে উঠবে তা ভাবতে পারলো না লতা। কি করবে? থাকবে, নাকি চলে যাবে এই ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চারু চোখ মুছতে মুছতে বায়ে তাকালো। আর ওমনি চারু-লতা চোখাচোখি। রক্তাভ চোখ নিয়ে চারু তাকিয়ে। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দুজন দুজনের দিকে। চারুই বলল,
– আপুমণি কিছু বলবেন?
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে লতা বেশ বিব্রত হয়ে পড়লো।
– আপুমণি, ভিজতাছেন যে…
– না, কিছু না।
চারু কাঁধ থেকে কাপড় তুলে মাথায় তুললো। লতা একটু দূরত্ব রেখে চারুর পাশে বসতে বসতে বলল,
– আমাকে দেখে মাথা কাপড় দেয়ার কি আছে? আমি পুরুষও নই বা তোমার শ্বশুড়িও নই।
চারু দাড়িয়ে গেল। তারপর তাড়াতাড়ি বলল
– আপামণি আপনের তো জ্বর হইবো। আপনে আমারে ডাকাইতেন। ক্যান ভিজতাছেন?
– বৃষ্টিতে আমার কিছু হয় না। আগে বল তুমি কেন এখানে বসে বসে কাঁদছো?
চারু যা বলল, তার সারসংক্ষেপ হচ্ছে চোখে কি যেন পড়েছে তাই একটু জ্বালা করছে। মানুষ যতই মিথ্যে বলুক তার চেহারায় কিছুটা হলেও সত্যটা ভেসে উঠে। একটা না বলা অভিমান লতা বুঝলো। এই অভিমান কিসের? স্বামীর ভালবাসা না পাওয়ায়, নাকি লতার প্রতি?
প্রথমবারের মত লতা অসহায় বোধ করলো। কেন এমনটা হলো সেটা ভাবার চাইতে আর কষ্টকর কোন কিছু মনে করতে পারছে না লতা। কিছু না বলেই লতা পুকুরপাড় থেকে উঠে চলে এলো। লতা বুঝতে পারলো দুজোড়া চোখ এখনও জলে ভিজে তার চলে যাওয়ার পথটুকুকে অনুসরণ করছে। হয়তো দু একটা দীর্ঘশ্বাসও।

(চলবে…..)

লিখেছেনঃ আনিকা ইসলাম
চারুলতার অন্যান্য পর্ব পড়ুনঃ হুতুমপেঁচা -তে।