হুতুমপেঁচা বলছি

অন্যরকম মেয়ের গল্পঃ “একজন অপরাজিতা”

মেয়েটা আর সবার থেকে আলাদা , একদমই আলাদা। “টমবয়” জেসি নামে আমাদের ভিকারুন্নেসা স্কুলে তার পরিচিতি ছিল। সাধারণ মেয়েরা যেখানে চুলে ঝুটি বা বেণি করে আসতো, আমাদের জেসি আপু আসতেন পুরাই অন্যরকম স্টাইলে বয়কাট চুল নিয়ে। জেসি আপুর মধ্যে ছিল না কোন মেয়েলী ন্যাকামি। সোজা সাপটা কথা বলতে আগের থেকেই পছন্দ করতেন। স্কুলের মেয়েদের মধ্যে ছিল তাকে নিয়ে অনেক কানা ঘুষা, সেগুলোকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জেসি আপু ছিলেন একজন বিজেতা। বাটা ওমেন্স হ্যান্ডবল চ্যাম্পিয়ান ছিলেন জেসি আপু, জেসি আপু ছিলেন আমাদের ভিকারুন্নেসার প্রতিটা মেয়ের গর্ব।

স্কুলে জেসি আপুকে খুব কাছ থেকে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা একদমই ছিল না কারণ জেসি আপু থাকতেন একরাশ ভক্তদের ভিড়ে। স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির গণ্ডি পেরিয়ে চাকরী জীবনে হঠাত করেই জেসি আপুকে আবার কাছে পেয়ে গেলাম। একদমই অপ্রত্যাশিত ভাবেই। খুব সকালে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে অফিসে যেতে পারতাম না এই জন্য একটা স্ট্যাটাস দিলাম সোশ্যাল মিডিয়াতে কেও যাতে আমাকে ডেকে তুলে। ইনবক্সে জেসি আপু নক দিলেন কোন ভূমিকা ছাড়াই বললেন নাম্বার দিতে সকালে উনি আমাকে ডেকে দিবেন। এই হল আমার হঠাত করেই জেসি আপুর কাছে চলে আসা। এরপরের গল্প আরো ভয়ানক আমি সকালে অফিসে যেতেই পারি না জ্যামের জন্য আর এদিকে অফিস থেকে আসার সময় কোন কিছুই পাই না। বেতন যেমনই পাই না কেন এই বেতন দিয়ে প্রতিদিন উবার বা সিএনজি করে যাওয়া আসা আমার একদমই সম্ভব না। জেসি আপু কোথা থেকে একদম দেবদূত হিসাবে হাজির হলেন আমাকে সকালে অফিসে নিয়ে যাওয়া আর নিয়ে আসা শুরু করে দিলেন। আপুর ভক্ত তো স্কুলেই ছিলাম আরো কাছ থেকে যখন আপুকে দেখলাম আমি ততই অবাক হলাম।

আপুর একটা অদ্ভুত স্বপ্ন আছে, আপু চান আমাদের দেশের মেয়েরা প্রতিদিন রাস্তায় যাওয়া আসার সময় যেই অপমান আর ভোগান্তির শিকার হয় তার এবার বন্ধ হওয়া দরকার। আপু চান মেয়েরা স্কুটি বাইক চালানো শিখুক এবং সকল প্রতিকূলতা ছাপায় নিজেদের চলার পথ নিজেরাই তৈরি করুক। আপু তো আমাকে অনেক সুন্দর ভাবে বাসায় নামায় দিয়ে চলে গেলেন। এদিকে আমার মনে হল, আপু একরাশ বিশাল আকাশ মনের ভিতর নিয়ে বসে আছেন যেখানে অনেক মেঘ  জমেছে। আমি সেই মেঘগুলোকে সরিয়ে দিতে চাই, আমি চাই সুর্যের দেখা যেন আপুর মনের আকাশে হয়।

ব্যস আপুর সাগরেদ হিসাবে নেমে পড়লাম কাজে, আমার হুতুমপেঁচা গ্রুপে শুরু হয়ে গেল মেয়েদেরকে সহোযগিতা করার আরো এক অধ্যায়। আপুকে আপুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য কাজে নেমে গেলাম আমি তৈরি হয়ে গেল মেয়েদের স্কুটি বাইক প্রশিক্ষণের জন্য একটি সংগঠন। আপুকে বলে দিলাম আর পিছনে ফিরে তাকানো সময় নাই আপনার। যে কথা সেই কাজ বাইক প্রশিক্ষণের ফর্ম দেয়া এবং জমা নেওয়া শুরু হয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল মেয়েদের জন্য বাইকের সন্ধান, প্রশিক্ষণের স্থান নির্ধারন করা। আপু এবং তার বন্ধুদের সহায়তায় স্বপ্নটা বাস্তবায়নের একদম শেষধাপে আজ আমরা। সবার সহযোগিতা আমাদেরকে আরো অনেক সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে এই প্রত্যাশায় করি।

আজ আমার জেসি আপুর জন্মদিন। আমি চাই জেসি আপু সব সময় সবার মনের ভিতরে একজন শ্রদ্ধা ভাজন মানুষ হিসাবেই বেঁচে থাকুক। যত বাধা বিপত্তিই আসুক না কেন অঙ্গীকার করছি আপুর এই স্বপ্নকে বাস্তবেই রূপ দিব আপুর পাশেই থাকব।

হুতুমপেঁচা বলছি……