অনুরণন

চারু-লতা (পর্ব- ২)

 

খুব সুন্দর এই ছোট গ্রামটি। ছবির মত গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদী। যা মিশেছে অনেক দূরে মেঘনা নদীতে। নদীর ধারে ফসলি জমি আর কিছু বাড়ি ঘর। বেশ নীরব গ্রামটিতে মানুষ সরল আর বেশির ভাগই অশিক্ষত। বাল্যবিবাহ এখানে সাধারন ব্যাপার। গ্রামের সবচেয়ে বড় বাড়িটি দেওয়ান সাহেবের। টাকা-পয়সার কোন অভাব নেই, শুধু মনের শান্তির অভাব ছিল। একমাত্র ছেলে হিমেল যে কিনা নিজের আপন সন্তান নয়, তবুও তার প্রতি ভালবাসাটা নিজ সন্তান থেকে বেশি। ঢাকা থেকে বড় পাশ দিয়ে সেখানেই ভাল চাকুরি করে।

প্রতিদিনকার মত খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামায শেষ করে বেরিয়ে পড়েন ফসলি জমি তদারকি করতে। সব সময় পড়োনে থাকে পাতলা কাপড়ের সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা। গ্রামের মানুষের কাছে সম্মান পেয়েছেন, তিনিই তাদের ভরসা। যে কোন সমস্যার সমাধান। নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতা, দেন-দরবারও করেন তিনি। গ্রামে শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য করেছেন অক্লান্ত পরিশ্রম।

বেশ বড় আর ছিমছাম দেওয়ান বাড়ি। যুদ্ধের সময় সব হারিয়েছিলেন। আবার নিজের চেষ্টায় সব ফিরে পান। তিনি বলেন এই ছেলেই তার সৌভাগ্য। যেদিন থেকে বাড়িতে আছে সেদিনই দেওয়ান সাহেব শহরে চাল পাঠানোর অর্ডার পেয়েছিলেন। সেই যে ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন হলো; আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ।

সকালে নাস্তার পর এক কাপ চা দিয়ে যায় কাজের ছেলেটা। নাম রহিম। রহিমের মাও এই বাড়িতেই কাজ করে অনেক বছর ধরে। যেখানটায় বসে চা পান করেন, সেখান থেকে বড় পুকুর দুটো দেখা যায়। এই পুকুর দুটোতে নানা রকম মাছ চাষ করেন। চা পান করতে করতেই পুকুরে যারা রক্ষনাবেক্ষণ করেন তাদের কাজের প্রতি লক্ষ্য রাখেন। নিজের ব্যবসা আর পরিবারের খাবারের চহিদা পূরণ করেন এই পুকুর দুটি থেকে প্রাপ্ত মাছ থেকে। তাই নিজেই সব দেখাশুনা করেন। নিজে দেখাশুনা করলে কাজে উন্নতি হয় এই ধারনায় বিশ্বাসী তিনি। চা পান করতে করতে পুকুরে কাজে ব্যস্ত দুজনকে কাজের নানা দিকগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। আর মাঝে মাঝে ভুলের জন্য তিরস্কার করছিলেন। কিছুক্ষন পর তিনি রহিমকে আবারও ডেকে বললেন,

– এ্যাই রহিম। এইদিকে আয় তো।

রহিম খুব কাজের ছেলে আর ডানপিটেও। দশ দিক সামলে হুটহাট অন্য ছেলেদের সাথে খেলতে চলে যায় বাড়ির পেছনের বড় মাঠটিতে। অনেকবার ডাকের পরেও খুঁজে পাওয়া গেল না। দেওয়ান সাহেবের চিৎকারে ঘুম ভাঙলো লতার। অথচ রহিমের রহিমের কোন খোঁজ নেই। দৌঁড়ে এসে লতা বলল,

– জ্বি বাবা?

– রহিম গেল কই?

আমি দেখছি বলেই লতা রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। ওই দিক দিয়ের বাড়ির পেছনটায় যাওয়া যায়। লতা জানে বার তের বছরের রহিম এই সময় সুযোগের সৎ ব্যবহার করছে, অর্থ্যাৎ মাঠে খেলছে। রান্না ঘরের সামনে দিয়ে যাবার সময় ভেতরে লক্ষ্য করতেই দেখলো ভেতরে একজন কালো শাড়ি পড়ে, মাথায় কাপড় দিয়ে সবজি কাটছে। নজর অন্য দিকে ঘুরিয়ে সে চলে গেল।

এই মেয়েটি হচ্ছে চারু। কৃষক পিতা আর কোন নাম দিয়ে যায়নি মেয়েটিকে। কালো গায়ের রঙ, আর একটু মোটা নাক। সৌন্দর্য যদি তার কিছু থাকে তাহলে তার চোখ। কাজল রাঙা চোখ। চুপচাপ, মাঝে মাঝে বেশ চটপটে। চটপটে স্বভাব তার খুব ছোট থেকেই। একসময় পুরো গ্রাম সে মাথায় তুলে রাখতো। লতার এই চলে যাওয়াটা নজর এড়ায়নি চারুর। চুপ করেই কাজ করে চলল সে।

রহিমকে পাওয়া গেল। দৌঁড়ে এসে রহিম দেওয়ান সাহেবের কাছে চলে এলো। বাবাহারা ছেলেটি হাপাচ্ছিল।

– এই তুই কই গেছিলি?

– দাদা ছিলাম তো, কাছেই ছিলাম। আপনের ডাক শুনি নাই।

– শুনবি ক্যামনে? আমি তো বুঝি। যা তেল নিয়ে আয়। আর শুন চারুরে আইতে ক আগে।

রহিম দৌড়ে রান্না ঘরে গেল। এই সময়ে চারুর রান্নার সময়। দুপুরের জন্য সে আগেই রান্না করে। দেওয়ান সাহেব চারুর সাথে তেমন কথা বলেন না। অদ্ভুত মায়া মেয়েটার চোখে মুখে।

– কিরে ভাত খাইসিস?

চারু কিছু বলল না, শুধু মাথা উপর নিচ করে বুঝালো, হ্যা, করছে।

– রান্না শেষ হইলে তোর মারে এই একহাজার টাকাডা দিয়া আইবি। আর আমার আলমারির ভেতর থাইক্কা ওষুধের প্যাকটও নিবি। মনে থাকবো তো?

আবারও মাথা নাড়লো মেয়েটা। এর মধ্যে রহিম দেওয়ান সাহেবের পায়ে ব্যথার তেল এনে মালিশ করা শুরু করে দিল। চারু এখনও দাড়িয়ে।

– কিরে কিছু কইবি? আহা, কি কইবি ক। এহনো এতো লজ্জা কিসের? তুই তো অন্য মানুষ না। আমার ঘরের মানুষ।

– আব্বা, আপনে কিছু না মনে করলে, আমি কয়দিন আম্মার কাছে থাকুম।

– কিন্তু এখন ক্যা? বউ আর পোলাডা যাক, তারপর যা। আর নাতিডা তো তোর হাতে না খাইতে পারলে খায় না।

চারু আইচ্ছা বলে রান্না ঘরে চলে গেল।

চারুর কথা কম বলার স্বভাব। কেউ দশটা কথা বললে সে একটার উত্তর দিবে। এমনিতে লাজুক, মনে চঞ্চল আর কাজে ধীর। সহজে রাগে না, আর রাগলে কারো ধার ধারে না। স্বল্প শিক্ষিত মেয়েটি বাবা গেছে কয় বছর আগে। দরিদ্র কৃষকের মেয়ে। বার মাস রোগাগ্রস্হ মা আর ডানপিটে ছোট ভাই ছাড়া আপন বলতে দেওয়ান সাহেব।

বাড়ির সমস্ত সাংসারিক কাজকর্ম চারু নিজ হাতে করে। সোলেমান মানে চারুর বাবা মারা যাবার বছর খানেক পর থেকপ এই বাড়িতে নিয়ে আসেন দেওয়ান সাহেব। গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দেওয়ান সাহেব ভর্তি করে দিলেও অনাগ্রহের কারনে কোন বিষয়েই পাশ করতে পারতো না। তাই বছর দুয়েক চেষ্টা করে আর স্কুলে গেল না। দেওয়ান সাহেব নিজের মেয়ের মত স্নেহ করেন। নিজের ছোট্ট মেয়েটা মারা যাবার পর থেকেই মেয়ে শিশুদের প্রতি তার অন্যরকম টান অনুভব করেন। বিধবা দরিদ্র মেয়েটিকে তাই নিরাপত্তার দায় নিজ কাঁধে অনায়াসে নিয়ে নিলেন।

আর সবচাইতে বড় কথা হল এমনিতে তিনি আনেন নি তিনি। এর জন্য তাকে অনেক বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। নিজের শিক্ষিত ছেলে হিমেলের সাথে বিয়ে দেন তিনি। আর তা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত তা বুঝতে খুব বেশিদিন লাগেনি দেওয়ান সাহেবের।

হ্যা! লতা হিমেলের দ্বিতীয় স্ত্রী। আর অশিক্ষিত চারু তার প্রথম স্ত্রী। যাকে সে কোন দিন মেনে নিতে পারেনি, আর লতা নিজে কোনদিনও চারুর মুখ ঠিক মত দেখেছে কিনা সন্দেহ। প্রতি বছর কয়েকবারই আসতে হয় গ্রামে তাদের দুজনকে। কিন্তু চারুর সাথে তাদের আচরণ সব সময়ই অপরিচিত মানুষের মত।

(চলবে…..)

লিখেছেনঃ আনিকা ইসলাম

চারুলতার প্রথম পর্ব পড়ুনঃ হুতুমপেঁচা -তে।