অনুরণন

চারু-লতা (পর্ব- ১)

তোকে নিয়ে যখন কিছু ভাবতে যাই অদ্ভুত এক না পাবার কষ্ট মনে কাজ করে। তোকে নিয়ে বস্তা পঁচা স্বপ্ন দেখতে তাই আর ইচ্ছা করে না। এখন স্বপ্নগুলো সব লাল রঙের সূতোয় ক্রস চিহ্নের মত। চাইলেও তোকে আর বলা যাবে না চল বৃষ্টিতে ভিজি। বলা যাবে না ঢাকা মেডিকেলের সামনে দাড়িয়ে চা খাবার কথা। মাঝে মাঝে সংসদ ভবনের ওপাশটা দিয়ে যখন যাই ইচ্ছে হয় বাদাম খাই। যদিও বাদাম আমার পছন্দ না। শুধু তোর ছোঁয়া আছে বলেই আজও আমি তোর দেয়া জবা ফুলটায় হাত বুলাই। ফুলটা শুকিয়ে গেছে সাত বছর আগেই। তবুও আজও তার গায়ের সুগন্ধটা হারিয়ে যায় নি।

আজকেও যখন তোর নাম্বারটায় ফোন দিলাম আবারও অবাক হলাম। মনে হলো শুনলাম সেই গানটা। রাতের অদ্ভুত মায়াগুলো যখন তোকে আমাকে জড়িয়ে দেয় আশ্চর্য বন্ধনে তখন তোর চোখে আনন্দের অশ্রুর অন্তরালে দুঃখের নদীটা আমি দেখতে পেয়েছিলাম। তোর মায়াবী চাহনি আর ডান চিবুকে কালো টিপটা সব হাসিকে নিমিষে অন্ধকার করে দিত তোর আমার স্বপ্নের খেলা ঘরকে। আমি বারবার অবাক হয়েছি তোর নীল চোখ দুটি কখনো আমাকে গ্রাস করতে পারেনি বলে। কালো চোখ আমার খুব পছন্দ।

গভীর চোখের মায়া না থাকুক, আকর্ষন ছিল প্রবল। জোয়র-ভাটার খেলার মত দুবেলা আমাকে রাঙ্গিয়ে দিয়ে দুবেলা সাদা করে দিতি। কি অদ্ভুত সময়। যতক্ষন সামনে ছিলি একবারও বুঝাতে পারিনি তুই চলে যাবার পর আমার আবার কাউকে লাগবে। মিষ্টি রাতকে আরো মধুর করতে তোর জায়গা আরো কেউ নিতে পারে ঐদিনগুলোতে তোর বিশ্বাস হতো না। যখনই হারিয়ে গেলি মায়া ছেড়ে আমি ঠিকই আবার স্বপ্ন বুনছি।

কাজলরেখা কি আরো কালো? তুই রাতকে ভালবাসবি বলে আরো কালোকে আলিঙ্গন করবি! জীবনের কঠিন ছকে যখন যান্ত্রিক জীবন ধাবমান, তখন ছোট স্বপ্নগুলোও নতুন মাত্রা নিয়ে না পূরণ হবার অতিকষ্টে নিজেকে হারাতে বসেছে। নিজেকে হারিয়ে খুঁজে পাবার ঘটনা ক্রমাগত নব দম্ভে যখন চোখের সামনে, ঠিক সেসময়ে প্রিয় মানুষের বিদায়ের শুভ ঘন্টার হাতছানি। ছাব্বিশ দিন পর যখন মনের রং আবার জলরঙে ছড়িয়ে ছিলাম, কেউ হয়তো বারে বারে ভালবাসার প্রমাণ দিতে ব্যস্ত।

ডাইরির পাতার সাথে প্রেমের সম্পর্কটা আরো গভীর হচ্ছে লতার। গভীর রাতের শুরুর সময়টা তার খুব প্রিয়। কারন পাশের প্রিয় মানুষগুলো নিদ্রায় মগ্ন, আর সে পাতার ভাঁজে মনকে প্রকাশ করে দেয়। প্রিয় মানুষের শুভ বিদায়ের ঘন্টা….। এ কেমন কথা! যদি কেউ আমাকে প্রশ্ন করে, তাহলে বলবো কিছু ভাল মানুষ আছে যাদের এই নষ্ট পৃথিবীতে মানায় না। তাদের একমাত্র স্থান হতে পারে স্বর্গ। আর ঐ ব্যক্তিদের জন্য বেঁচে থাকাটাই স্বর্গের সাথে তার দূরত্বের পথটা দীর্ঘ করার একমাত্র কারণ। বলেছিলাম সমাজের ভাল মানষগুলো সব সময় অসহায়। আমরা তাদের কাঁধে নির্ভরতার হাতটি না রেখে পিঠ টান দিয়ে ফাঁকি দেই। হয়তো কোন দিন নিজের প্রয়োজনে তাকে ব্যবহার করে বেমালুম ভুলে যাওয়ার অদ্ভুত নাটক করতেও আমাদের বিবেকে বাঁধে না।

কাজল-রেখার জীবনটাও তাই এক অদ্ভুত ছকের মারপ্যাচে এক হয়ে গেল। নিতান্তই অপ্রত্যাশিতভাবে যখন কাজলের আগমন লতার জীবনে, তখন সূর্যাস্তের ঢের দেরি। তবে কে কার জীবনে অযাচিতভাবে জায়গা দখল করে নিল তার সে প্রশ্নের সীমা অতিক্রম করেছে। তার পরিণতি নিয়ে ভাবার সময় লতার আর সুযোগ হলো না। কারণ শশুড় ততক্ষণে লতাকে ডেকে পাঠালো।

– বউমা, আমার পায়ের ব্যথাটা খুব বেড়েছে।

– আচ্ছা বাবা, এবার ঢাকা যাবার সময় আপনিও আমাদের সাথে চলুন।

– ডাক্তার মনে হয় বেশি ভাল না। আমাদের গ্রামের রফিক ডাক্তার তো রোগী না দেখেই ঔষধ দিতে পারে। ঢাকার ডাক্তারদের বলো আমাদের রফিক ডাক্তারের কাছে ট্রেইনিং নিতে।

মাঝেমাঝে এমন সব কথা দেওয়ান সাহেব বলেন যে, লতার যেমন মাঝেমাঝে হাসি পায়, আবার কান্নাও। তবে আজ তার সত্যিই খুব রাগ হল। শশুড় সবই জানেন এবং বুঝেন, তাও না বুঝার ভান। আর এই ভানের প্রধান কারন, রাজধানী শহরটি তার খুব অপছন্দের। তবে এটাও বুঝে শরীরের ব্যাপারে পছন্দ অপছন্দের কোন মূল্য নেই। লতা রেগে গিয়ে বলল,

-বাবা আপনি ব্যাপারটা এতো হালকা ভাবে নিবেন না। এমনও হয়েছে সঠিক চিকিৎসা না করার কারনে পঙ্গু হয়ে গেছে। আপনি কবে বুঝবেন বাবা?

দেওয়ান সাহেব বুঝলেন ছেলের বউ তার বার্ধক্যের কারনেই এভাবে জোর গলায় কথা গুলো বলেছে। একসময় দেওয়ান সাহেবকে সবাই ভয় করতো। তার গিন্নী সালমাও কোন দিন সাহস করেনি কিছু বলার। আজ পুত্রবধূর কথা শুনে নিজের মৃত মেয়েটার কথা মনে পড়ে গেল। ফুটফুটে মেয়েটার ফুলে উঠা লাশটা যখন মালাদের পুকুরে ভেসে উঠেছিল, সালমা তখন পুকুরপাড়েই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল। ছোট শিশুটাকে কোলে নিয়ে দৌড়ে গ্রামের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে ছোট শরীরে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাওয়া কল্পনায় আনা যায় না।

সেদিন দেওয়ান সাহেব আর তার স্ত্রীর মনের অবস্হা কেমন ছিল তা হয়তো সন্তান হারা দম্পতিরা বলতে পারতো। পাগলপ্রায় সালমার জন্য তখন একটি ছেলে শিশু তিনি দত্তক নিয়ে আসলেন। স্বাধীনতার যুদ্ধে বাচ্চাটির মা বাবা দুজনই মারা যায়। তিনি হিমেলকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসে সালমার কোলে দেয়ার সাথে সাথেই প্রায় ছুড়ে ফেলে দেয়ার মত অবস্হা। বাড়ির অন্যান্যরা মিলে ছেলেটিকে আঘাত থেকে রক্ষা করে।

– আমার মাইয়া চাই। বুচ্ছেন? আমার মাইয়া চাই। পোলা দিয়া কি করুম আমি? আমার সুন্দর মাইয়াডা……

কান্না আর রাগের মিশ্রণে অনেক গুলো কথা বলছিলেন তিনি। যার কিছু বুঝা যাচ্ছিল বাকিগুলো সালমার ঠোঁটের কোনে মিলিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেল।

কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। ওদিকে সাত মাসের হিমেল ক্ষুধায় অস্থির কান্না জুড়ে দিল। আপাতত বিধবা বোনকে দায়িত্ব দিয়ে দিল।

– তুই এই বাচ্চাডা কেমনে রাখবি। সালমা তো পাগলী হইয়া যাইতেছে দিন দিন। আর এই বাচ্চা আনার দরকার কি ছিল? নিজেই তো পয়দা করতে পারতি। আর আনলিই যখন একটা মাইয়াই আনতি!

– বুবু কি করুম? মাথায় কিছু আসে না।  আর তুই তো জানসই অর আর বাচ্চা হইবো না। আর আমার একটা পোলা দরকার আছিল। মাইয়া হইছে তাই কষ্ট লাগছিল। এতো সম্পত্তি কেডায় দেখবো? তোয় বুবু মাইডারে তো আমি আদর করতাম। সালমা তো বুঝলো না।

– এই পাগলী নিয়া কি করবি? তিন বৎসর হইলো। যেমন ছিল তেমনই আছে।

গায়ে হাত হাত বুলাতে বুলাতে মোমেনা আরেক বিয়ের প্রস্তাব ভাইকে দিয়ে বসলো। আর যথারীতি দেওয়ান সাহেব তা প্রত্যাখান করলেন। সালমাকে তিনি ভালবাসেন। মেয়ে শোকে আছে কয়দিন পর ঠিক হয়ে যাবে। আর তা ছাড়া বাচ্চাটা সালমাকে ধীরে ধীরে আবার মা করে তুলবে। বাচ্চাটার যত্ন নিতে বলে তিনি গন্জে চলে গেলেন।

পুরনো কথা মনে করতে করতে বর্তমানে চোখের সামনে হিমেলের স্ত্রীর কথা গুলো আর কানে ঢুকছিলো না। লতার শাসনে ছোট বাচ্চার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে ভালই লাগছিল। মৃত মেয়েটা যাবার পর থেকে প্রতিটা সময় মেয়েকে মনে করে নিজেকে ক্লান্ত করেছে, বিপি হাই করেছে, কিন্তু মনের বেদনাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কষ্ট কয়েকশগুণ বেশি হয়েছে, কারণ সালমা মেয়ের শোকেই ইহকালকে বিদায় জানিয়ে পরকালকে নিজের আপন করেছে।

(চলবে……)

লিখেছেনঃ আনিকা ইসলাম মৌরি