মুক্তধারা

অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি

আজকে আমি ডাক্তার হতে পেরেছি যে বাবার কারণে, সেই বাবা-ই একদিন সিলেট মেডিকেলে চান্স পেয়েও পড়তে পারেননি!! নিজের বাবার তখন সেই অবস্থা না থাকায় তাঁর কাছ থেকে সামান্য ভর্তির টাকা জোগাড় করতে পারেনি বলে আজ সে নামি কোনো প্রফেসর হতে পারেননি, হয়তো আজ আমি থাকতাম কোনো মেডিকেল এর কোনো প্রফেসর এর মেয়ে!! দাদার সেদিনের সেই অক্ষমতার কষ্ট আমার বাবা নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে পুষিয়েছেন ১০০০০০%!! ডাক্তারি পেশার সাথে নিযুক্ত থাকার অদম্য ইচ্ছার কারণে আজ থেকে ৪০বছর আগে আমার বাবা প্রশিক্ষণ নিয়ে সার্টিফিকেটধারী ফার্মাসিস্ট (A person trained in pharmacy and licensed to practice) হয়ে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ঔষধের ব্যবসাকে!!

আমার গর্ব হয় বলতে, আমার বাবা নিজ ক্লাশের স্টুডেন্টদের পড়িয়ে নিজের চলার খরচ জোগাড় করতেন, এত্ত ট্যালেন্ট একজন মানুষ যে কিনা সমবয়সী ছেলেমেয়েদের পড়ানোর ক্ষমতা রাখতেন- তিনি সারাটাজীবন শুধুমাত্র ঔষধের ব্যাবসা করে,নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে,প্রতিদিন গড়ে ১০০ বা তারও বেশি গরীব রোগীর ফ্রী চিকিৎসা দিয়ে, সকাল থেকে রাত ফার্মেসীতে কাটিয়ে একটা একটা করে মেডিসিন বিক্রি করে সেই টাকা দিয়েই আমাদের দুই ভাইবোনকে দেশের সবচেয়ে নামকরা স্কুল-কলেজে পড়ালেখা করিয়ে আজ একজনকে ডাক্তার একজনকে চার্টার্ড একাউন্টেন্ট বানিয়েছেন!!

সারাজীবন যেই ফার্মেসীর চেম্বারে অন্যান্য ডাক্তাররা বসতেন এবং আমার বাবা তাঁদেরকে স্যার-ম্যাডাম বলে সম্মান দিয়ে কথা বলতেন,আর ঘরে এসে বলতেন-

“মাত্র ৫টা হাজার টাকার অভাবে আজ আমি ডাক্তার না, কিন্তু একদিন আসবে,যখন আমার মেয়ে বসবে এই চেম্বারে”

 আজ তাঁর সেই চেম্বারে আমি বসতে পারছি- শুধুমাত্র তাঁরই অবদানে- এটাযে আমার জন্য কত্ত বড় কিছু- তা হয়তো এভাবে লিখে কোনোদিন প্রকাশ করা যাবেনা!! কতোটা অমানুষিক পরিশ্রম করলে, কতোটা ডেডিকেশন একটা মানুষের থাকলে সে একই পেশায় দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময় কাটিয়ে দিয়েছেন এবং তার ১০০% হালাল উপার্জন দিয়ে রাজধানী ঢাকার মতো যায়গায় নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছেন তিল তিল করে!! আজ তাঁর কোনোকিছুর অভাব নেই, হাজারো গরীব মানুষের দোয়া, সম্মান, বাড়ি-গাড়ি, যায়গা-জমি, ছেলেমেয়ের অবস্থান- সবই আল্লাহ্‌ তাঁকে দিয়েছেন- কিন্তু এই এতসব কিছুর ভীড়ে তাঁর সেই সুযোগ হারানোর সে কষ্ট আজো আমি তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট দেখতে পাই!! আজ আমি এমবিবিএস ডাক্তার হয়েছি তো কি হয়েছে, আমি জানি, আমি আমার বাবার সমপরিমাণ ঔষধের জ্ঞান আরো ১০বার জন্ম নিয়ে এমবিবিএস পড়লেও অর্জন করতে পারবো না!!

সন্তানের জন্য বাবার লুকিয়ে থাকা কষ্ট এবং পরাজিত মুখের বেদনার চেয়ে বড় আফসোস আর কিছু হতে পারেনা!! আমি গর্ববোধ করি, আমি আমার বাবার মেয়ে,আমি এমন একজন বাবার মেয়ে!!

হয় আমার বাবা, নাহয় বাবার বাবা, নাহয় বাবার বাবার বাবা- প্রতি ফ্যামিলিরই কোনো না কোনো বাবার গল্প এটা!! প্রতিটা ফ্যামিলিতেই এমন একজন করে বাবা ছিলো বলেই পরবর্তী জেনারেশন হয়তো সুখের মুখ দেখার সৌভাগ্য নিয়ে দুনিয়ায় আসছে!! ভালো থাকুক প্রতিটা বাবা!! আর আমরা- আসুন, রেস্পেক্ট করি প্রতিটা বাবার পেশাকে, তাঁর কষ্টকে,তাঁর অমানুষিক পরিশ্রমকে!!

লিখেছেনঃ  ডাঃ তামান্না মাহফুজা তারিন