মুক্তধারা

ভিন্ন প্রথা

আমাদের সমাজে প্রচলিত বিবাহের যত রীতি আছে আমি মনে হয় সবগুলির ঠিক বিপরিত দিকে চলেছি। এখন স্বভাবতই অনেকের মনে প্রশ্ন আসবে আমি এমন কি করেছি। আমার গল্পের শুরুটা এখানেই।

‘মেয়ের বয়স হচ্ছে, বিয়ে কবে?’
‘বেশি শিক্ষিত মেয়েকে ভাল ছেলেরা বিয়ে করতে চায় না’
‘বিয়ের পর প্রেম জানালা দিয়ে পালায়’, ইত্যাদি নানান কথার সম্মুখিন হয়েছি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর থেকেই। অনেকের মত ভাগ্যবান আমি না যার পরিবার থেকে এ বিষয়ে পুরোপুরি সমর্থন ছিল। মোটামুটি সবার কাছ থেকেই কথা শুনতাম। ভালো লাগতো না এগুলা শুনতে।

একটা মেয়েকে বিচার করা হত তার হাসব্যান্ড কি করে বা উনার পরিবার কতোটা সচ্ছল, মদ্দা কথা স্ট্যাটাস-ওয়ালা কিনা। এসব আমার ভালো লাগতো না কখনই। সব সময় ভয় দেখাতো পড়ালেখায় ভালো না করলে বিয়ে দিয়ে দিবে। কথাটা নিছক কথার কথা ভাবতে পারেন অনেকে, কিন্তু আমার জন্য এটা ছিল যেমন সত্য তেমনি ভয়াবহ। একজনকে চিনিনা, জানিনা, হুট করে বিয়ে করে ফেলাটা আমার কাছে যুক্তিগত কোন কালেই ছিল না। আমি এমন একজনকে আমার পাশে চাই যে আমকে সবসময় সাহস জোগাবে, আমাকে অসাধ্য সাধনে বাঁধা না দিয়ে উল্টো সাহায্য করবে; আমি চাই বন্ধু, পার্টনার, কিন্তু গুরুগম্ভীর মাতব্বর চাইনা। কোন এক অজানা কারনে এই ধরনের পাত্রের বরই পছন্দ ছিল আমার পরিবারের। এখানে একটু বলে রাখি, আমি পরিবার বলতে শুধু আমার বাবা, মা, ভাইবোন এর কথা বলছি না, আমি এখানে আমার পুরো চৌদ্দ খানদানের কথা বলছি।

যেটাই হোক বহুত কষ্টে নিজেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত আনলাম। এর মধ্যে প্রায় শ’খানেক পাত্র দেখানো হয়ে গেছে। সবার কথা একটাই, একটা মেয়ের বিয়ে না হলে তার জীবনই বৃথা। ভাবতে অবাক লাগে, পরীক্ষায় ভালো করার জন্য আমার বাবা যিনি আমাকে বলতেন আমাকে হিলারি ক্লিনটন এর মতো হতে হবে, সেই মানুষটাই আবার আমাকে বলেন যে বিয়ে না করলে আমার জীবন বৃথা। একই মানুষের দুরকম চেহারা দেখার পর আর ভালো লাগলো না। নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম, বিয়ে করলে নিজের পছন্দে করবো, নিজের টাকায় করবো, প্রমান করবো এসকল সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে ইচ্ছা থাকলে যাওয়া যায়। আরও সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ে করলে একান্ত কিছু কাছের মানুষগুলোকে নিয়ে করবো। নিজের পয়সা খরচ করে দাওয়াত দিয়ে মানুষকে খাওয়ায় তাদের বদনাম শুনবো না।

উপরওয়ালা আমার এই ইচ্ছা পূরণের জন্য পাঠিয়ে দিলেন আমার জীবনসঙ্গীকে। কিভাবে মাত্র আট দিনের মাথায় আমরা বুঝে গিয়েছিলাম যে আমরা Soulmate. এরপর অনেক অসমতল সময় আর মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি শেষ করেই মাস্টার্স-এ ভর্তি হলাম। আমার ভালো এবং খারাপ দুটো সময়েই আমার পাশে ছিল আমার জীবনসঙ্গী। তার ব্যাপারে আমার পুরো পরিবার কখনই রাজী ছিল না। মাস্টার্স এর শেষের দিকে জিবনের প্রথম চিন্তা করলাম যে এবার বিয়ে করা যায়। গিয়েছিলাম বেড়াতে বন্ধুদের সাথে চট্টগ্রাম,বেড়াতে যাবার আগে মাথায় আসলো বিয়ে করবো, এখন না করলে কখনও করা হবে না।

বাসে উঠবার আগে ছোটভাইদেরকে আগেই বলে দিয়েছিলাম যে আমার জন্য নেমেই কাজী ঠিক করবি, আমি বিয়ে করবো। আমি ভেবেছিলাম আমার এই বাচ্চামি আবদার আমার সঙ্গী নাকচ করে দিবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সে নিজেও রাজী হয়ে গেলো। আল্লাহ্‌র রহমতে শুক্রবারে আমাদের বিয়ে হয়। মানুষ কবুল বলার পরে কাঁদে এই চিন্তা করে যে বাবা-মা”র বাসা ছেড়ে যেতে হবে। আর আমি আধা ঘণ্টা কেঁদেছিলাম খুশিতে, বিশ্বাস হচ্ছিলো না যে আমার শেষপর্যন্ত এমন একজনের সাথে বিয়ে হয়েছে যে আমার পাশে থাকবে বন্ধুর মতো, ঠিক যেরকমটা আমার পছন্দ।

আমার বিয়ের কাহিনীটা ঠিক সিনেমার মতো। বিয়ের পর খাবারের আয়োজন করলাম হোটেল এ। আমার খুব সখ ছিল যে খাবারের মেন্যু থাকবে চাইনীজ, এবং আমি শাড়ি পড়ে বিয়ে করতে চাইনি। আল্লাহ আমার এই ছোট্ট আবদারটাও ফেলেননি। আমি নতুন থামি কিনলাম, আর ও বীচ-শার্ট, এভাবেই বিয়ে হল আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। পরবর্তীতে আমারা আমাদের পরিবারকে জানালাম। ওর পরিবার আমাকে নিজেদের মেয়ের মতো করে আগলে নিলো। যেই সাপোর্টটা আমি আমার পরিবার থেকে পাইনি, সেটা আমি পেলাম এই পরিবারে এসে। এখন আমি সত্যিই ভাগ্যবান মনে করি নিজেকে। এরকম জীবনসঙ্গী, এবং তার পরিবার খুব কম মানুষের ভাগ্যেই জূটে।

শেষপর্যন্ত, না আমি এখনও আমার বিয়ের রিসেপশন দেইনি। দেবার ইচ্ছা আছে কিন্তু শুধু আমার নতুন পরিবার এবং বন্ধুদের নিয়ে, যাতে সবাই মজা করতে পারি এবং কোন ধরনের নেতিবাচক কথা কাউকে না শুনতে হয়। আমি কাউকে ভুল প্রমানিত করার জন্য কিছু করি নাই, আমি শুধু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছি নিজের যোগ্যতা দিয়ে। আমি আরেকজনের পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করতে চাইনি। এটা আমার মনে হয় মোটামুটি সবারই কামনা।

আমার শুধু খারাপ লাগে এ কারনে যে এখনও অনেক ভালো শিক্ষিত পরিবারেও পুরনো ধারণা রয়ে গেছে। আমারা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে খারাপ মেয়ে, বেয়াদপ, বেশরমের পাল্লায় পড়ে যাই। ছেলে-মেয়ে দুজনই সমান মুখে ঠিকই বলছেন, কিন্তু মেয়েকে আগে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন বয়স হয়ে যাচ্ছে, সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে একথা ভেবে। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন যে আপনার মেয়ে চিরজীবী নয় যে বার্ধক্য আসবে না। যে আপনার মেয়েকে সেধে নিতে আগ্রহী, তাকে স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে নিয়ে যেতে পরিবদ্ধ, তার কাছেই মেয়েকে দিন।

ছেলের পরিবার অনেক ভালো, ছেলে অনেক শিক্ষিত, শুধু Biodata সংগ্রহ করে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বিয়ে পাকা করাটা বোকামি ছাড়া কিছুই না। তার মানে এই না যে আমি আরেঞ্জ ম্যারেজে বিশ্বাসী না। যেটাই করুন, দুইজনের মতামত নিয়ে করুন। এখানে বিয়ে হচ্ছে দুইজনের মধ্যে, আমাদের সমস্যাটা হল বিয়ে হয় দুই পরিবারের মধ্যে।

পরিবারের সম্মানের কথা চিন্তা করেই অনেক নারী এখনও মুখ বুজে কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছেন। তাদের জন্য বলছি, অন্যের কথায় কান দেয়া বন্ধ করেন। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। আমি আজ নিজের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত, আর আমি বন্ধু পেয়েছি জীবনসঙ্গী হিসেবে, এখন সবার মুখ বন্ধ। আমার হাসব্যান্ড আমার কাজ করার পিছনে প্রেরণার উৎস। আমি এতেই খুশি।

লিখেছেনঃ  K. N. Rahaman