মুক্তধারা

আমি কথন : একটাই আমার তুমি

আমি মেয়েটা বরাবরই একটু স্বপ্নবাজ টাইপের। গান শোনা, মুভি দেখা, উপন্যাস পড়া এগুলো আমার খুব খুব পছন্দের কাজ। আর তাই নাটক গল্প সিনেমার মত ড্রামা কুইন টাইপ হয়ে গিয়েছি নিজের অজান্তেই। বারারান্দায় বসে কফি খেতে খেতে বিকেল দেখা, ছাতা থাকলেও বৃষ্টিতে ভিজা, রোমান্টিক মুভি দেখে কেঁদে একাকার করে ফেলা এসব আমার জন্য কমন ব্যপার।শুধু তাই না আমার ফ্রেন্ডের কোন শেষ  নেই। ক্লাব করতাম সবসময় তাই সিনিয়র জুনিয়র খাতির এর বড় ছোট ভাই বোনেরও কোন অভাব ছিল না। আর এই সব কিছুর উপর ছিল আমার প্রচন্ড চঞ্চল স্বভাব। কথা বলা ছাড়া আমি পাঁচ মিনিটের বেশি থাকতে পারি না।তাই আব্বু আম্মু যখন আমার বিয়ের জন্য ছেলে দেখা শুরু করল আমার এই এইসব নেচার আব্বু আম্মুর জন্য একটা যথেষ্ট চিন্তার কারন হয়ে দাঁড়াল। আর আমি তো আমি। আমারও নখরার কোন শেষ কোন কালে ছিল না। কত বিবাহযোগ্য পাত্র যে কত কারনে আমার অপছন্দ হয়েছে। আমার আমার এসব নখরা আমার আব্বু আম্মু দাঁত কিড়মিড় করলেও গুরুত্ব দিত।

এমন করে মোটামুটি তিন বছর গেল। আমার কাউকে ভালো লাগে না। কারো আমাকে ভালো লাগে না। এই করে করে সেই দিন টা আসলো যেই দিন তা আমার জীবন সব সময় এর জন্য বদলে দিল। ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫। আমি তখন আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়ে নিয়ে মহা ব্যস্ত। সেই দিন আমার ফ্রেন্ডের বাসায় আমার রাতে থাকার কথা। বিকেল থেকে ওখানে নাচের রিহারসেল হবে। এর মধ্যে যখন আব্বু আমাকে কারো সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা বলল আমি তখন মহা বিরক্ত। আমি দেখা করতে গিয়েছিলামও চোখ মুখ কুঁচকে। এরপর যখন সেই মানুষটার সাথে কথা বলা শুরু করলাম যার সাথে আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম আমার কুঁচকানো কপাল আস্তে আস্তে সমান হতে থাকলো। আমাদের পছন্দের মিল, তার খোলামেলা মানসিকতা, হাসিখুশি কথাবার্তা সব কিছুর কারনে আমাদের দুইজনেরই কথা বলতে ভালো লাগছিলো। এরপরের ঘটনাতো এতই দ্রুত ঘটল যে আমরা দুই জন কিছু বুঝারই সময় পেলাম না। ঠিক বিশ দিনের মাথায় আমাদের বিয়ে হয়ে গেলো। আমাদের বিয়ের দিন ছিল আমাদের থার্ড দেখা।

আমাদের সেকেন্ড দেখা হওয়ার ঘটনাটা একটু মজার। সেইদিন সন্ধ্যায় রিদেনদের বাসা থেকে সবাই এসেছিল আমার জন্য আকদ এর ডালা নিয়ে। আমার তখন প্রচন্ড মাথা ব্যথা। রিদেন আমাকে ফোন দিয়েছে। আমি ওকে মজা করে বলছিলাম ডালাও চলে আসলো আর যার সাথে বিয়ে সে আমাকে এখনও প্রপোজও করলো না। বলে ফোন রেখে আমার হবু শ্বশুরবাড়ির সবার সাথে গল্প করতে ব্যাস্ত হয়ে গেলাম। আধা ঘন্টা পড় দেখি ফোন নিচে নামো, আমি তোমার বাসার নিচে। এতো বড় ধাক্কা মনে হয় আমি জীবনে অনেক কম পেয়েছি। আর আমার ফাজিল ভাই বোন গুলাতো কাহিনি শুনেই ডিপজল স্টাইলে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করলো। দুলাভাই বলেন আমাদেরকে কি দিবেন নাইলে আপুকে দেখা করতে দিবো না। একে তো  বাসায় শ্বশুরবাড়ির সবাই, তার উপর ভাই বোনগুলোর প্যারা। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে লজ্জায় লাল নীল বেগুনী হয়ে আম্মুকে বললাম ঘটনা। আম্মুও হাসে।হেসে বলে দুই পাগল একত্র হয়েছে, না ? নিচে যখন দেখা করতে নামলাম তখন আমাদের বাসার নিচের প্রতিটা গার্ড আর ড্রাইভার কারো দাঁত বন্ধ হচ্ছিল না। তাদের সামনে তখন বিশাল এক এন্টারটেইনমেন্ট চলছিল। তো আমার জন্যও কিছু এন্টারটেইনমেন্ট অপেক্ষা করছিল।  আমার হবু হাজবেন্ড রিদেন আমাকে বলল, তোমার কি খুব মাথা ব্যথা হচ্ছে? আমি বললাম, হুম। এরপর সে আমার হাতে এক পাতা D’Cold Total দিয়ে বলল, ‘So. . . Will you marry me ?’ আমি তো মনে মনে ভাবছি কত ফিল্মি চিন্তা করে কথাটা বললাম আর এটা কি হল ! এমন এপিক ভাবে কেউ মনে হয় কাউকে প্রপোজ করেনি। বললাম, পরে বলব।

আমাদের আকদের আগে আমরা দুই জন দুই জন কে জানার কোন সময়ই পাই নি। তাই আকদ আর রিসিপশন এর মাঝের ছয় মাস ছিল সব চেয়ে সুন্দর। অনেকটা মা বাবার পারমিশনে প্রেম করার মত। আমরা খুব ঘুরতাম। ঢাকায় ঢাকার বাইরে। আর রোজ নিজেদেরকে জানতাম। এই সময়েই জানতে পেরেছিলাম যে রিদেন কুমার বিশ্বজিতের খুব ভক্ত। ও খুব পছন্দ করে নতুন নতুন খাবার এক্সপ্লোর করতে। ফ্যামিলির যে কোন বিয়েতে রিদেনের গান মাস্ট। আর যত দ্রুত ওর রাগ আসে তত দ্রুত নেমেও যায়। আরও কত কি।

তবে দুইটা মানুষ দুই জনকে সবচেয়ে বেশি জানে এক ছাদের নিচে থাকা শুরু করলে। আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে জানি এখন। আকদের পরও যা ছিল সেটা নিজেদের শুধু ভালো দিকটা জানা। কিন্তু দুইটা মানুষ যখন বিয়ের পর একসাথে থাকে তখন শুধু ভালো দিকটাই দেখে না। দুইটা মানুষ ঘুমানোর সময় কিভাবে শোয় কিভাবে নাক ডাকে, রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠতে কত টুকু কষ্ট হয়, একজন খুব গোছাল আরেক জন প্রচন্ড অগোছাল, রাগ উঠলে কে কি করে, ওয়াশরুম কেমন থাকতে হয় এই প্রত্যেকটা জিনিস একটু একটু করে জানে। আমরা জেনেছি, জানছি। কখনও ঝগড়া করে কখনও মেনে নিয়ে দুই জন দুই জনের পজেটিভ নেগেটিভ দিক গুলো এক্সেপ্ট করছি। এটাই হয়ত সংসার। এভাবেই হাজবেন্ড ওয়াইফ নিজেদের মধ্যে ভালবাসা খুজে নেয়। আমরা যখন একসাথে মুভি দেখি সেটা আমাদের ভালবাসার মুহূর্ত। আমরা যখন দিন শেষে একসাথে ডিনার করি সেটা আমাদের ভালোবাসার মুহূর্ত। আমরা যখন ঝগড়া করতে করতে হঠাত হেসে দেই সেটাও আমাদের ভালবাসার মুহূর্ত। যখন রাগ করে কোন কথা ছাড়া দুই জন পাশাপাশি বসে থাকি সেটাতেও আছে ভালবাসা। বিয়ের পরের ভালবাসাটা আসলে অন্যরকম। এটার কোন তুলনা নেই। রিদেনের ভাষায় যেটা হল , ‘আমরা কি কাপল নাকি আমরা তো হাজবেন্ড ওয়াইফ’। হয়ত তাই।

আমরা দুইজন এমনি। সব বিরক্তি রাগ কমপ্লেইনের পরও আমরা দুই জন দুই জনকে ভালবাসি। দুইজনের ভালদিক গুলকেই না খালি। দুইজনের অপছন্দের দিক গুলকে। দুইজনের বিরক্তির দিক গুলকে। দুইজনের ল্যাকিংস গুলকে। কারন একটা কথা আছে না Two imperfect people make a perfect relationship. তাই আমরা দুই জন দুই জনের জন্য পারফেক্ট। আর সারাজীবন আমি এভাবেই থাকতে চাই। ছোট ছোট মুহুরতে।ছোট ছোট খুশিতে। কিন্তু অনেক বেশি ভালবাসায়।

লিখেছেনঃ নিশাত সাইফ বাধন