অনুরণন

ভাগ্যচক্র

(১)

খুব শক্ত করে সালেহা বেগম নিতুকে ধরে রেখেছে। আলিম সাহেব দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তার বউ আর মেয়েকে দেখছে কিছুই বলছে না। তার কাছে মনে হচ্ছে এই পুরো ঘটনাটা এর আগেও কোথায় জানি হয়েছে ঘটেছে তখনকার সময় আর এখন কার সময় পুরোটাই একরকম। বাবুল তাদের কাজের ছেলে এসে বললেন খালুজান চেয়ারে এসে বসেন। আলিম সাহেবের মনে হচ্ছে অনন্ত্য কাল ধরে তিনি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তাকে ভবিষ্যতেও দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

নাঈম আর রাজীব মসজিদে এসে দাঁড়িয়ে আছে আধাঘণ্টা হল। ইমাম সাহেব খানা খেয়ে নেমে আসবেন সেই অপেক্ষায়। এদিকে বেশি দেরি করলে পুলিশের ঝামেলা পোহাতে হবে। নাঈমের মনে হচ্ছে একটা রামদা নিয়ে এসে কয়েকটাকে কোপানো দরকার তার মধ্যে তার বাপ একটা। প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে সে এক দলা থুথু ফেলল।

ওসি আনোয়ার সাহেব অনেক গম্ভীর মুখে বসে আছেন। চারিদিকে অনেক গুঞ্জন চলছে। সরকারি আমলার বাসা তাই কিছু সিকিউরিটি সাথে আনতেই হইসে। কিন্তু এরপরেও উৎসুক মানুষের কানাঘষা চলচ্ছে। সবারই এক কথা কি হবে। ওসি আনোয়ার আলিম সাহেবের দিকে তাকায় বললেন –

“স্যার আমাকে কিছু বলেন না হলে আমাকে তো নিয়ম পালন করতে হয়। আপনার কি মতামত সেটা জানলেই আমি সামনের কাজটা করতে পারি”।

(২)

ভোর ৪টা নাঈম আর রাজীব মাটি কোপাচ্ছে, ইমাম সাহেব প্রথমে রাজি ছিলেন না অনেক টালবাহানা এবং নগদ দশহাজার টাকার বিনিময়ে তারে রাজি করানো হয়েছে। বলেছে ফজরের নামাজটা পরেই আসবে, নামাজের আর ১৫ মিনিটের মত বাকি। আলিম সাহেব দূরে দাঁড়িয়ে নাঈম আর রাজীবকে দেখচ্ছে। আজকে সে তার ছেলে আর ছেলের বন্ধু রাজীবকে দেখে বিস্মিত এরকম সন্তানেও হতে পারে!! এবং এই দৃশ্যটাও বা এই ঘটনাটাও অনেক আগে একবার সে দেখেছে।

কোন ভাবে শেষ কাজটা করে যে যার বাসায় ফেরত গেলে। রাজীব একা একা একটা সিগারেট ধরায় খাটে শুয়ে আছে খুব তীব্র কান্না পাচ্ছে তার প্রচণ্ড। টেবিলের ড্রয়ারে রাখা অনেকগুলো চিরুকুট বের করল সে এইবার আর নিঃশ্বাস নিতে পারছে না কিছুতেই পারছে না। সম্ভব না এইভাবে তার একা একা বাঁচা সম্ভব না তাকেও চলে যেতে হবে এবং অনেক দ্রুত, একগাদা ঘুমের ওষুধ মুখে পুড়ে শুয়ে পড়ল রাজীব।

সালেহা বেগম নিতুর ঘর থেকে এক চুল নড়েন নাই। বাড়ি ভর্তি মানুষ অনেকেই অনেক কিছু করছে কেও তার প্রিয় ডাইনিং এর সেট বের করে খাবার খাচ্ছে। কেও পর্দায় হাত মুছছে। কেও এখানকার জিনিষ ওখানে রাখচ্ছে ,খালি পায়ে ঘর-বাহির করচ্ছে। এসব দেখেও তার আজকে কিছু বলতে বা চিৎকার করতে ইচ্ছা হচ্ছে না তার চুপ করে থাকতেই ভাল লাগচ্ছে। মনে হচ্ছে কথা বলার কোন প্রয়োজনীয়তা তার আর নেই আর কোনদিন কথা না বললেও চলবে।

নাঈম কেটে যাওয়া হাতে ব্যান্ডেজ করছে। তার মনে পড়ল এলাকার জহির ভাইয়ের কথা বলেছিল যে কোন প্রয়োজনে ওনাকে মনে করতে। আজকে নাঈমের সব থেকে প্রয়োজন জহির ভাইকে। কাল শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা , নাহ নাঈম এইবার পরীক্ষা দিবে না, কোন বারেই আর সে পরীক্ষা দিবে না।

(৩)

২রাত আগের ঘটনা- নিতু চিৎকার করে কাদচ্ছে, প্রচণ্ড কাদচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে। সে বার বলছেঃ “ বাবা ওরা আমার সাথে এমন কেন করল? আমি কি করসি? আমার কি দোষ?”

সালেহা বেগম তার থেকেও চারগুণ জোড়ে বলে উঠলেনঃ “চুপ বেয়াদপ, খানকি মাগী কি দরকার ছিল তোর ওদের সাথে তর্ক করার? মেয়ে মানুষের এত দেমাগ কেন থাকবে। খুব ভাল হইছে এখন মর , মরে আমাদের উদ্ধার কর”।

আলিম সাহেবের কেমন জানি গা গুলিয়ে উঠচ্ছে এই চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ওনার মনে হচ্ছে এই ঘটনাটা ওনার সাথেই ঘটবে এইটা উনি জানতেন। উনি কাঁপাকাঁপা হাতে ফোন তুলে ডায়েল করলেন, একবার পুরো ডায়েল হল ওপাশ থেকে কেও ফোন তুলে ধরল না আবার করলেন এইবার ফোন ধরেই মিজান তার বন্ধু বলে উথলঃ “আলিম দোস্ত বাদ দে , যা হইসে হইসে , আমাদের দুইজনেরই বাচ্চারা না বুঝে করসে, তুই কিছু মনে করিস না, আমাকে ক্ষমা করে দে, আর ভবিষ্যতে এমন হবে না, তুই শান্ত থাক ভাবি আর নিতুকে শান্ত থাকতে বল একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন রাখি”। আলিম সাহেবকে কিছু না বলতে দিয়েই মিজান সাহেব ফোন রেখে দিলেন মুর্তির মত করে আলিম সাহেব ফোন ধরে বসে থাকল।

রাজীব চিৎকার করে কি বলছে নাঈম কিছু বুঝতেছে না , কোন নিতু? কে এই নিতু? তার বোন? কি হইসে তার সাথে ? রাজীব বলেই যাচ্ছে মিজান আঙ্কেলের ছেলে আর তার বন্ধুরা মিলে সবার সামনে তার বোনকে মেরেছে গায়ে হাত দিয়েছে। বুকের কাপড় ছিঁড়ে দিয়েছে ওড়না নিয়ে চলে গিয়েছে। আর যাওয়ার সময় চিৎকার করে তার বোনকে গালি দিয়েছে। কেন? কেন করেছে এসব? তার মনে পরছে দিনের পর দিন নিতু বলত তাকে মিজান সাহেবের ছেলে আজেবাজে কথা বলে প্রস্তাব দেয় সে আমলে নেয় নাই । একই কলোনিতে বড় হইসে সে নিজেও দেখেছে রাতুলকে , সিগারেটের আড্ডায় কতবার তাদের দেখা হছে রাতুলকে তার এমন ছেলে মনেই হয় নাই। কিন্তু রাতুল এটা কি করল তার বোনের সাথে? রাজীব কিছুতেই থামছে না সমস্যা কি এই ছেলের এমন করে চিৎকার করছে কেন?

খাবার টেবিলে নিতু নেই অন্যান্যদিনের মত। বাকিরা সব্বাই আছে। বাবুল আর তার মা রান্নাঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আলিম সাহেব গলায় জোড় এনে বললেনঃ “ যা হয়েছে তা আর হবে না আমাকে মিজান কথা দিয়েছে, তার ছেলে আর কোন কিছু করবে না , নিতুকে স্বাভাবিক হতে সময় দাও আর একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে, আর সালেহা অকে এরপর থেকে ভাল ভদ্র কাপড় পড়ে বের হতে বলবে এসব আজকালকার সালোয়ার কামিজগুলো বড়ই খোলামেলা। দুই –তিনদিন বাসায় থাকুক এরপর সব ঠিক হলে আবার ক্লাসে যাবে । ক্লাস টেন এর পড়া অত সহজ না আমরা রাত দিন পরতাম। তোমার মেয়েকে বলবা পড়াশোনায় মন দিতে”

সালেহা বেগম সম্মতির মত করে মাথা নাড়ল। নাঈম বলে উঠলঃ “মিজান আঙ্কেল কি তোমার কাছে ক্ষমা চাইসে বাবা? ওনাকে বল সবার সামনে এসে ক্ষমা চাইতে”। সালেহা বেগম আলিম সাহেব কে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলে উঠলঃ “এত কিসের বাড়াবাড়ি? তোর বোন তো ধোয়া তুলসী পাতা না, মেয়ে মানুষের এত কিসের দেমাগ? এত হাসাহাসি কিসের বান্ধবীদের সাথে? এর এত কিসের মেলামেশা তোর বন্ধু রাজীবের সাথে? এসব কারণেই তো আজ এইটা হইসে চুপ করে থাকতেই পারে না মুখে মুখে সারাক্ষণ কথা বলতেই হয়, কি দরকার ছিল ঐ ছেলের নামে কোচিং এর স্যারের কাছে বিচার দেয়ার’? নাঈম বলে উঠলঃ বিচার দিবে না এতদিন ধরে তোমাদেরকে বলতেছে তোমারা কিছু করস? সালেহা বেগম বললেনঃ কি করব আমরা? ওই ছেলেকে ধরে থাপড়াবো নিজের ঘরের মাগী ঠিক নাই আর অন্যর ছেলে কে ধরে মারব।

নিতু সব কিছু বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে শুনলো, তার অনেক খুধা লেগেছে সেই সকাল ১১টায় ভেলপুরি খেয়েছে এরপর আর কিছু খাওয়া হয় নাই। আজকের পুরো সময়টা কেমন করে যাচ্ছে সে কিছু বুঝতেই পারছে না, বুকের ডান পাশটা জ্বলচ্ছে ,রাতুল এত জোড়ে খামচি দিয়েছে যে রক্ত পড়ছিল। রাজীবের সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে নিতুর মনে হচ্ছে রাজীব সামনে দাঁড়ালেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

আর ২মিনিট পরেই নিতুদের বাসা রাজীব প্রতিদিন এইসময় এই বাসার সামনে দিয়ে যায় নিতু বারান্দায় দাঁড়ায় । যাবার মুহূর্তে নিতুর গোল মুখটা দেখে রাজীব চলে যায়। আজকেও সে যাবে কিন্তু নিতুর দিকে তাকাবে না ততদিন নিতুর দিকে তাকাবে না যতদিন রাতুলকে ছিঁড়ে ফানাফানা করে দিতে পারে। নিতু বারান্দায় দাঁড়ায় আছে রাজীবকে দেখচ্ছে। রাজীব খুব দ্রুত আসছে এদিকে নিতু জানে রাজীব তাকে কখনই ভুল বুঝবে না রাজীব তার দিকে তাকাবে একটা হাসি দিবে সব কষ্ট যন্ত্রণা অপমান শেষ হয়ে যাবে। রাজীব আসছে…

(৪)

বাবুল এসে প্রথম সালেহা বেগমকে জানালো নিতু ঝুলচ্ছে, আসরের নামাজের পর থেকে মেয়েটা ঝুলেছে ফ্যানের সাথে। তার নিজের হাতে গত ঈদে কিনে দেয়া শাড়িটার সাথে ঝুলচ্ছে তার মেয়ে। আজ সারাদিন নিতুকে সে অনেক গাল-মন্দ করেছে সকাল ১১টা থেকে মেয়েটা বারান্দায় দাঁড়ায় ছিল। একচুল নড়ে নাই। সালেহা বেগমকে একটা চিরুকুট লিখে গেছে সেঃ “মা মরতে বলেছিলে তাই মরে গেলাম। আমি আর কোনদিন হাসবো না আর কোনদিন জোড়ে কথা বলব না তোমাকে আর কোন রাগ করে কথা বলার সুযোগ দিবো না। আমার জন্য তোমাকে আর কষ্ট পেতে হবে না মা”। সালেহা বেগমের মনে হচ্ছে এই জীবনে সে সব কথা বলে ফেলেছে আর কোন কথা বলার নাই।

নিতুর লাশ নাঈম আর রাজীব নামাচ্ছে, ঠিক তখন থেকেই মনে হচ্ছে আলিম সাহেব এই সব কিছু কোথায় যেন দেখেছে। লাশ বলে পোস্ট-মার্টেম হবে, কেন হবে? ওসি সাহেবকে মিজান চল্লিশ হাজার টাকা দিয়েছে আর তাকেও ফোন করে বলেছে ঘটনাটা এখানেই ধামা চাপা দিতে। শ্বাসকষ্টে মারা গেছে মেয়ে এমন রিপোর্ট করে দিতে বলে চলে গিয়েছে। ইমাম আত্মহত্যা লাশের জানাজা পরবে না কেও কবর খুঁড়বে না পড়ে দোষ হাজার টাকা দিয়ে নাঈম আর রাজীব সব বন্দোবস্ত করেছে। লাশ দাফন হয়েছে। নাঈম দরজা লাগিয়ে আছে, সে আর কোন দিন বাবার মুখ দেখবে না বলে গিয়েছে। রাজীব ছেলেটাকে আলিম সাহেব দেখেছে সব কাজ করছে কিন্তু তার ভিতরের তীব্র কষ্ট দেখা যাচ্ছে মুখে চোখে।

আলিম সাহেবের হঠাত করেই মনে পড়ল আজ কে থাকে প্রায় ২৮ বছর আগের কথা, শেফালির কথা। শেফালি ছিল অঙ্ক স্যারের মেয়ে, জব্বার স্যারকে সব্বাই অনেক ভয় পেত কারণ স্যার অনেক মারতেন সব্বাইকে। কিন্তু শেফালিকে আলিম সাহেবের অনেক ভাল লাগত। রাস্তার পাশে, ক্লাসে, বাসার সামনে অনেকবার সে শেফালিকে নিয়ে গান করেছে কাগজ ছুঁড়ে মেরেছে, হাত ধরেছে। হুম্ম হাত ধরার পড়ে জব্বার স্যার তাদেরকে অনেক মেরেছিল এমন মার মেরেছিল যে অনেকদিন সোজা ভাবে হাটতে পারেন নাই। কিন্তু সমস্যা হল শেফালি পড়ে একদিন রাস্তায় তার দিকে তাকায় হেসেছিল আর তাই সে শেফালিকে শাস্তি দেবার জন্য মিজান আর রফিক কে নিয়ে একটা প্ল্যান করেছিল। শেফালিকে ব্যবহার করে তারা যখন অপমানের প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে মনে করে আরাম করে চা খাচ্ছিল তখন শুনতে পায় শেফালি ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়েছে। প্রথমে খারাপ লাগলেও পড়ে আর কাহ্রাপ লাগে নাই। সব কিছু ভুলেই গিয়েছিল সে এত বছরে, নিতু তার মেয়ে আজ অনেক কিছু মনে করায় দিচ্ছে। নিতু যেভাবে চিৎকার করেছিল পরশু সন্ধ্যা ঠিক সেভাবেই শেফালি করেছিল। শেফালির লাশ দাফনের সময় কেও ছিল না। জব্বার স্যারের কোন ছেলে না থাকায় সে একা একা মেয়ের কবর দিয়েছিল, ভ্যাগিস আলিম সাহেবের একটা ছেলে আছে। না হলে তাকে এইভাবে কবর খুড়তে হত। শেফালির মৃত্যুর পর জব্বার স্যার কোনদিন আর কলেজে আসেন নাই আর কখনো রাস্তায় তাদের সাথে দেখা হলে বিড়বিড় করে কি জানি বলতেন। সেই কবেকার এসব কথা এরপর সে বোকাসোকা সালেহা বেগমকে বিয়ে করেছেন। তিনি আর মিজান মিলে সরকারি আমলা হয়েছেন কম কষ্ট হয় নাই তাদের এতদূর আসতে। আর তাদের বন্ধু রফিক দেশের বাইরে প্রবাসী। সবই ঠিক ছিল সব কিছু কিন্তু নিতু, নিতুটাই যেন সব কিছুর  ভেতরের অস্তিত্বের ঠিক তলে কোথায় জানি একটা কিছুর অঘটন দেখায় গেল। হঠাত আলিম সাহেব কেঁপে উঠলেন তিনি আগে ব্যাপারটা দেখেন নাই আজ মনে হচ্ছে-নিতুর মুখটাও কিন্তু গোল ছিল ঠিক যেন শেফালির………

(গল্পের সকল চরিত্র কাল্পনিক কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তা একান্তই কাকতালীয়)

লিখেছেনঃ আনিকা সাবা