মুক্তধারা

তুমি কি আসলেই ওনার মেয়ে?

“তুমি কি আসলেই ওনার মেয়ে???!!! আমার মার দিকে তার বিস্মিত দৃষ্টি,আর আমাকে দেখে তো তার প্রায় কান্না করার উপক্রম।
হ্যা ভাই,আমার মা যতটাই উজ্জ্বল,আমি ঠিক ততটাই অনুজ্জ্বল।
আমি কালো আর দেখতে অসুন্দর হতে পারি কিন্তু আমার মায়ের ই মেয়ে আমি।
আমার মা আমাকে যখন জন্ম দিয়েছেন তখন উনি সদ্য HSC পাস করা উচ্ছ্বল মেয়ে।আমরা যে বয়সে বিভিন্ন মানুষের উপরে ক্রাশ খাইসি,সেই বয়সেই তিনি মা হয়েছেন।

সদা চঞ্চল আমার কমবয়সী মা বলেন-“তুই যেদিন জন্ম নিয়েছিস,সেইদিন ছিল তুমুল বৃষ্টি।”মফস্বলের সেই হাসপাতালে ওই মহাদুর্যোগের দিন ছিল না কোন ডাক্তার।এক নার্সের সহায়তায় আমি শেষ পর্যন্ত মা কে লেবার পেইনের অসহনীয় কষ্ট থেকে মুক্তি দেই।প্রথমবার মা হওয়ার আনন্দে উনি খুশিতে ঘুমাতেই পারেন নি কিন্তু কি জানতেন আমার জন্যই কত কথা উনাকে শুনতে হবে?

ছোট্ট আমিও কি বুঝতে পেরেছিলাম গায়ের রং এ মানুষ বিচার করা হয় এই সমাজে বিশেষ করে মেয়েদের !!
ঘোর শ্যামবর্ণ তার পাশাপাশি ছিলাম অসুন্দর আর বোঁচা নাকের অধিকারী,নানা মানুষের নানা কথা চলত,বউ এত সুন্দর মাইয়াটা কেমুন জানি !!
মা খুব কাদঁতেন তবুও তার কাছে আমিই ছিলাম দুনিয়ার সবচে সুন্দর বাচ্চা।আমার নিজের দাদী পর্যন্ত নাক কুচঁকে ফেলেছিলেন আমাকে দেখে,সেই আমি যখন বড় হচ্ছি তখন এমনিতেই বুঝে গিয়েছিলাম আমি কতখানি কম গুরুত্বপূর্ণ।

কারো সামনেই ঠিকমত মাথা উঁচু করে কথা বলতাম না,আপনা আপনি মাথা নিচু থাকত।
যেকোন বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি সবাইকে চেয়ে চেয়ে দেখতাম,কত সুন্দর সবাই !!
নিরব কান্না যে কেউ দেখতে পেত না তখন।

অসুন্দর মেয়েদের যে ভালবাসতে নেই….হ্যা…আমিও তাই ভেবেছি…কিন্তু তারপরও পিছপা হই নি,মন তো আর আমার মত দেখতে ছিল না।
এখানেও যে শুনতে হয়েছে নানান কথা-“তুই এই মাইয়ার সাথে প্রেম করস?!! দোস্ত তোরে সুন্দর মাইয়া দেই? চাইলেই তো পাবি…এই মেয়ে তো খালি অসুস্থই থাকে..!”

এরাও হারিয়ে যায় একসময় সময়ের অন্তরালে,ভয় হয়েছে পথ চলতে। নিষ্ফল আক্রোশে আয়না ভেঙ্গে ফেলতে মন চাইত।
উপলদ্ধি আসে নিজের মাঝে কোন একদিন,মানুষের অবজ্ঞার দৃষ্টি কে আর কত পাত্তা দিব?
নিজেকেই যে পাত্তা দিতে ভুলে যাচ্ছি…..
অনেক সুন্দরের মাঝেও অনেক কুৎসিত কে দেখেছি তাই আজকাল কেউ এইসব বললে আপন মনেই হাসি আর বলি-“তোরা শুধু আমাকে দেখেই গেলি…আমাকে চিনলি না…”

লিখেছেনঃ শারমিন ইলা