মুক্তধারা

আম্মুই আমার বন্ধু

হাতে এক কাপ ধূমায়িত চা। চা আমার প্রতিদিন যে কোন এক বেলা বা দুবেলার সঙ্গী। আজকের ভোরটা আমার জন্য অন্য রকম কারণ আমি আমার মাকে নিয়ে লিখবো আজ। আম্মুকে নিয়ে প্রথমবারের মত কিছু লিখবো যা কোন ই-ম্যাগ এ প্রকাশিত হবে। এবারের প্রকাশনীর জন্য একমাস আগেই বলা হলেও কিছু কারনে লিখতে বসতে দেরি হয়ে গেল। কিছু কারন যেমন, আলসেমি। হাতে অনেক সময় থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে লিখতে বসেছি।

আমি শব্দের খেলায় খুব একটা পারদর্শী নই, তবুও লিখি কারন খুব ছোট বয়স থেকেই এটাই আমার মনের ভাব প্রকাশের একটা মাধ্যম ছিল। যখনই নিজেকে বুঝতে চাইতাম তখনই কিছু লিখে ফেলার চেষ্টা করতাম। আম্মুকে নিয়ে লেখা এমন কিছু  পুরোন ডায়রিতে আছে।

বলা হয় মা হচ্ছেন সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেএ। যারা ছোটবেলায় মাকে কাছে পায় না তাদের চিন্তাধারা আর আমরা যারা সৌভাগ্যবান বা সৌভাগ্যবতী মাকে কাছে পেয়েছি তাদের চিন্তাধারায় বিস্তর ফারাক উপলব্ধি করা যায় এবং দেখা যায়। মায়ের প্রতি ভালবাসা শুধু একদিনের জন্য না, প্রতিদিনই ভালবাসার।

প্রথমেই বলতে চাই আমার মাকে নিয়ে কিছু কথা। অত্যন্ত ধৈর্যশীল, তবে বেশ রাগি একজন মানুষ। এক সময় ভাবতাম আম্মু যদি একজন শিক্ষক হতেন তাহলে ছাএদের জন্য কি উদবেগের কারণই না হতো। এমনটাও ভাবতাম আম্মু আমাকে মোটেও ভালবাসে না।  এতো বকা দিলে ঐ বয়সে কি করে বুঝবো বকাটাই ছিল তার ভালবাসা। ছোটবেলায় খুব ভুল বুঝতাম আম্মুকে। ধীরে ধীরে আম্মু আমার হয়ে গেলেন আমার সবচাইতে কাছের বান্ধুবী। এমন একজন বান্ধুবী যাকে হাজারটা অন্যায় করার পরেও বলা যায়, আম্মু আমি এই ভুলটা করেছি আমাকে এখন বাঁচাও। সব সময় এই মানুষটি আমার পাশে থাকছে, আমাকে সাহস দিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের দুই ভাই বোনের পছন্দের সব কিছু তার জানা। মাছের বড় টুকরোটা আমার জন্য বরাদ্দ। আবার ছোট ভাইয়ের পছন্দের খাবারও করে দিচ্ছে। আমাদের দুই ভাই বোনের কমন একটা অভিযোগ হচ্ছে “আম্মু তোকে বেশি আদর করে”।

আম্মু যেন সিনেমার মাদের মত। কোন কিছু বলা লাগে না মুখ দেখেই সব বুঝে নেয়। ব্যাপারটা মাঝে মাঝে আমাকে বেশ ভাবায়। কি করে সম্ভব! হয়তো অবদানটা আমার ভাব ভঙ্গির। জীবনের সমস্ত সূক্ষ্ম বিষয় হোক সেটা ছোট কিংবা বড় মাকে ছাড়া আমার চলে না। জীবনে এতোটা নির্ভরতার জায়গা আমার জন্য আর রাখেননি সৃষ্টিকর্তা।

জীবনের সব শিক্ষাই বলতে হবে আম্মুর কাছ থেকে পাওয়া। কোন ভুল হলে বুঝিয়ে দিয়েছে, আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলেছেন। কখনও হতাশ হবো না এমনটা আম্মুকে দেখেই শেখা আমার। অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেয়া, নিজেকে ছোট না করা, এবং মানুষকে সম্মান করাটাও।

আমার প্রতিবাদী চরিএটি আম্মু থেকে পাওয়া। কখনও বলেননি, মেয়ে হয়েছ তাই সব মুখ বুজে সহ্য করে যাও। বরং বলেছেন, “মেয়ে হয়েছ মাথা নিচু করে রাখবে না, তবে অহংকারী হবে না, আর অন্যায় কখনও সহ্য করবে না। নিজেকে প্রতিষ্ঠা করো। বড়দের শ্রদ্ধা করবে”। যদি কখনও কেউ আমাকে কালো বলেছে আর আমার মন খারাপ হতো, আম্মুই আমার মন ভাল করে দিয়ে বলতো, আমার মেয়েই সবচাইতে সুন্দরী। কারণ আমার মেয়ে গোমরামুখো না। এটাও বলতো, “মনের সৌন্দর্যই মানুষের আসল সৌন্দর্য”।

পৃথিবীতে প্রতিটা মায়েরই উচিৎ মেয়েদের শুধু নৈতিক ও ঘরের কাজের শিক্ষা দেয়া না, দিতে হবে স্বাবলম্বী হবার শিক্ষা দেয়া। এই স্বাবলম্বী হওয়া মানে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়াটা না। কারণ এই ক্ষেত্রে মা শুধু সুযোগ তৈরি করে দিতে পারেন বাকিটা নিজেকে করে নিতে হয়। শিক্ষাটা হতে হবে মানসিকভাবে স্বাবলম্বী হবার শিক্ষা।

লিখেছেনঃ আনিকা ইসলাম মৌরি