মুক্তধারা

আমি কথন : মা আমার মা

একটা মজার মেমে দেখেছিলাম ফেইসবুকে। বাচ্চাদের ১০ বছর পর্যন্ত আম্মু সব জানে। ১০ বছরের পর আম্মু অনেক কিছু জানে। ২০ বছরে যেতে যেতে আরে ধুর আম্মু কিছু জানে নাকি। কিন্তু আবার ২৫ বছরের পর আম্মুই আসলে ঠিক তাই যে কোন এডভাইজার আম্মু। কথাটা শতকরা ১০০ ভাগ সত্যি। একটা বয়সে আমরা নিজেকেই ঠিক মনে করে আম্মুর উপর রাজ্যের বিরক্তি প্রকাশ করি। আসলে যে আম্মুই ঠিক বুদ্ধি দেয় এটা বুঝি অনেক পরে। এটা মনে হয় আমাদের সবার সাথেই হয়েছে।

আমি আমার আম্মুর বড় মেয়ে। আমিও এমন ছিলাম। এক সময় আম্মুর কথায় সব করতাম। এরপর কলেজের গন্ডিতে যেতে যেতে নিজেকে সবজান্তা সমশের মনে করা শুরু করেছিলাম। কিন্তু সময় ঠিকই বুঝিয়ে দিয়েছে আম্মুরা সব সময় রাইট। আমি এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালবাসি আমার আব্বুকে। কিন্তু রাজ্যের যত কথা যত সমস্যা শেয়ার সব আম্মুর সাথে। মন ভালো মন খারাপ মেজাজ হট সব আম্মু জানবে। এর পর আমার ভুল ধরিয়ে দিবে আমাকে যে আমি কোথায় ভুল।  আমার বিয়ের পর থেকে ফোনে সব চেয়ে বেশি কথা আমি মনে হয় আম্মুর সাথে বলি। টুকটাক সারা দিনএর হাবিজাবি যত কথা আমার আম্মুর সাথে। আজকে কোথায় গেলাম আম্মু কি দিয়ে ভাত খেলো আব্বু সকাল বেলা আম্মুকে কি বলেছে আমার বোনের কোচিং এ কি হল এই সব হাবি জাবি। আম্মু কখনও আমাকে ছাড়া কিছু করে না। টেইলারে যাবে আমাকে নিয়ে মার্কেটে যাবে আমাকে নিয়ে কোথাও কোন কাজ সেটা করতে যাবে আমাকে নিয়ে। আমি হয়ত মাঝে মাঝে রাগ হয়ে যাই যে তুমি তো একা পারো আমার জন্য কি। আম্মু যখন বলে উঠে ভালো লাগে না আমার তোমাকে ছাড়া যেতে তখন আসলেই আর কিছু বলার থাকে না আমার। আম্মুরা মনে হয় এমনি হয়। আমি জানি সবাই এখন বলে উঠবে যে হ্যাঁ ঠিক আমার আম্মুও আমাকে ছাড়া কোন কাজ করতে চায় না। আমার সব চেয়ে পছন্দের কাজগুলোর একটা হচ্ছে আম্মুর সাথে ম্যাচিং ড্রেস পড়া। এটা আমি আর আম্মু প্রায়ই করি। যদিও তখন আমার থেকে আম্মুকেই বেশি সুন্দর লাগে। আমার ফ্রেন্ডদের থেকে সারা জীবন আমার একটা কথা শুনতে হয়েছে তুই আন্টির মেয়ে হয়ে এমন খ্যাত কেন? আন্টি তো সেই জোস। কথাটা ঠিক আম্মু আমার আইডল। কিন্তু আম্মুর মত আমি সামান্যতমও হতে পারি নাই।এটা যে আমার কত বড় দুঃখ বলে বুঝাতে পারবো না।

একটা কথা আছে যে মায়ের পর খালাই নাকি যে কোন বাচ্চার সব চেয়ে কাছের হয়। কথাটা যে কতটা সত্যি। আমার খালাদের কলিজা আমি। আমি ওদের কাছে ওদের নিজের বাচ্চার মত।এই জন্যই হয়ত আমার কাজিনগুলো আমার নিজের ভাইবোনের মত।পিচ্চি থাকতে আমি খালামনি বলতে পারতাম না বলতাম মানামনি।বড় হয়ে গিয়েছি কিন্তু ডাক টা রয়ে গিয়েছে এখনওো।কারন আমার খালামনিদের ই ইচ্ছা ছিল এই ছোট্টবেলার ডাক টাই থাকুক সবসময়। এই আমি যখন ছোট ছিলাম আম্মুর কাছে যেসব আবদারের জন্য না শুনতে হত সেই গুলো পূরন হত শী মানামনির মানে শীল্পি খালামনির কাছে। দুনিয়ার যত উদ্ভট আবদার সব পুরন করত শী মানামনি। কোন কিছুতে না নেই। এতো ধৈর্য শী মানামনি কিভাবে পেতো জানি না। আর শী মানামনির কারনেই হয়ত ওর ছেলে মেয়ে দুই জনের কাছেই বড় বোন আমি। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমার ভাই বোন দুইটা সব জায়গায় আমাকে শো করেও বড় বোন হিসেবে। আমার বিয়ের সময় আমার ভাই অরিয়ন বাংলা ২য় পত্রের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে স্কুলে এপ্লিকাশান করেছিল ‘বড় বোনের বিয়ে উপলক্ষে ছুটি চেয়ে আবেদন’ আর সেটাতে শী মানামনির সিগনেচারও ছিল। কারন অরিয়ন থাকলে আমার কাজে হেল্প হবে। শী মানামনি এমনি। কিভাবে আমার সুবিধা হই কিভাবে আমার হেল্প হয় সবসময় সেই দিকে নজর।

আর আমার ঘুরাঘুরির আবদার সব ছিল সামি মানামনির কাছে। এখনও মনে আছে আমার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হওয়া মানে পরদিন ই সামি মানামনির বাসা আর এক মাসব্যাপী ঘুরাঘুরি। একবার কনকনে শীতে একদম বিকাল বেলা আমি বলেছিলাম ফ্যান্টাসি কিংডম যাবো। তখন ফ্যান্টাসি কিংডম নতুন নতু চালু হয়েছে। সাথে সাথে আমার ইচ্ছা পুরন হয়েছিল। সেই শিতের কনকনে রাতে আমরা ছাড়া কেউ ছিল না আর রাইডগুলোতে উঠার জন্য। কিন্তু তারপরও সামী মানামনি আর ইকবাল আংকেল নিয়ে গিয়েছিল আমাদেরকে। যে কয়দিন সামী মানামনির বাসায় থাকতাম, অফিস থেকে এসেই সামী মানামনি আর আংকেলের কমন প্রশ্ন আজকে কোথায় যেতে চাও? কি যে দিন ছিল সেই দিনগুলো !

আম্মুর পর যদি আর কারো কাছে আমি আম্মুর মত আদর পাই সেটা আমার এই দুই মানামনি। মার মত বলেই হয়ত ছোটবেলা থেকে আমি ওদেরকে খালামনি না ডেকে ‘মা’নামনি ডেকেছি। মায়ের নাম আসলে আমি তাই এই দুইজনের কথাও বলব।

মায়ের মত বললে আরেকজন মানুষের কথা আমি বলব। আমার সুমি ফুপ্পি। আব্বুর খালাতো বোন কিন্তু কি পরিমান আদর যে আমি তার কাছে পেয়েছি। ফুপ্পি যখনই আমাদের বাসায় বেড়াতে আসত অথবা আমরা যেতাম অলিখিত ভাবেই আমার খাওয়া গোসল ঘুম সব কিছুর দায়িত্ব হয়ে যেত সুমি ফুপ্পির। আর ছিল রাতে আমাকে গল্প বলতে বলতে ঘুম পাড়ানো। কিভাবে যে আমাকে সময় দিত সুমি ফুপ্পি। ঘরের কাজ পড়ালেখা সব করত আর আমাকে দেখত। আমি যে কটা দিন ফুপ্পির কাছে থাকতাম ওর জন্য যেন ঈদ। কারন সারাটা দিন আমি ওর পিছন পিছন ঘুরব। আর এটাই খুব পছন্দ ছিল সুমি ফুপ্পির।

এই মায়েদের সাথে তো আমার রক্তের সম্পর্ক। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও আরেকজন মা আছে আমার। সেই মাকে আমি পেয়েছি বিয়ের পর। আমার মা যে আমাকে কিভাবে সাপোর্ট দেয় সেটা আমি বলে বুঝাতে পারবো না। আমি রান্না খুব একটা পারি না। কিন্তু মা কখনও আমাকে সেটা নিয়ে কিছু বলেন না। বলেন আমরাও কি বিয়ের আগে পারতাম না নাকি অত। আমরা দেখতে দেখতে শিখে গিয়েছি তুমিও শিখে যাবা। আমার কোন পরীক্ষার সময় যদি আমি রান্নাঘরে যাই মা আমাকে রান্নাঘর থেকে ভাগিয়ে দেন। বলেন যাও পড় , আগে পরীক্ষা ভাল করে দাও। মা আমাকে খুব বেশি ইন্সপায়ার করেন জব করার জন্য। কোথায় এপ্লাই করলাম কোন দিন পরীক্ষা সেটা কেমন হল সব জানেন তিনি। আমি যেদিন প্রথম আসলাম এই বাসায় সেদিন দেখি মা খেয়াল করে আমার প্রয়োজনের প্রত্যেক্টা জিনিস আমার রুমে ওয়াশ রুমে এনে রেখেছেন। একটা মেয়ের প্রতিদিন যা যা খুঁটিনাটি জিনিস লাগে প্রত্যেকটা জিনিস মা খেয়াল করে এনে রেখেছেন আমার জন্য। মায়েরা ছাড়া অন্য কেউ আসলে পারে না এতোটা খেয়াল রাখতে।

এই মানুষগুলো না থাকলে হয়ত আমি আজকে আমি হতে পারতাম না। আর ভবিষ্যতে যা হব তাও হতে পারবো না। বছরের একটা দিন মায়েদের জন্য না কথাটা ঠিক। জীবনের প্রতিটা দিন আমাদের মায়েদের জন্য। কিন্তু একটা বিশেষ দিনে মায়েদের একটু ঢাকঢোল পিটিয়ে ভালবাসা জানালে ক্ষতি কি। মা দিবসে তাই এর বেশি কি চাইতে পারি যে পৃথিবীর সব মায়েরা ভালো থাকুক নিরন্তর। আর আজীবন মায়েদের এই অকৃত্রিম ভালবাসায় ভালো থাকুক আমার মত প্রতিটি সন্তান।

লিখেছেনঃ নিশাত সাইফ বাধন