মুক্তধারা

বেঁচে থাকার গল্প

আমার যখন ডিভোর্স হয় আমার বয়স ২৯ আমার ১৪মাসের এক ছেলে কে নিয়ে উঠলাম আমার নতুন ঘরে। আমার স্বামী আমাকে ভাল করেই জানিয়ে দিল যা কিছু প্রয়োজন আমাকে দিয়ে দিবে শুধু সে আমার সাথে থাকতে পারবে না । কারণ তেমন কিছু না আমি তার যোগ্য নই। আমি সাধারণ ডিগ্রি কলেজের লেখাপড়া জানা একটি মেয়ে আর সে ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে। পারিবারিক পার্থক্যও অনেক। আমি জানি না কেন সে আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আমি তাই বিসিএস ক্যাডার পাত্র দেখে বাবা- ভাই আর অন্য কোন কিছু চিন্তা না করেই আমার বিয়ে দিয়ে দিল।

বিয়ের দিনের কথা মনে পড়ে আমার হাতে কোন সোনা নাই দেখে শাশুড়ি মা হুঙ্কার দিয়ে বললেন একটা বালাও দিতে পারলো না একমাত্র মেয়েকে? কি অদ্ভুত বালার সাথে যে আমার নিজের সম্মান জড়িত ছিল আমি জানতাম না । বিয়ের দিনে অনেক খারাপ লাগচ্ছিল আর তারপরে না খেয়ে থাকার কারণে অনেক ঘুম পাচ্ছিল কিন্তু বলাই বাহুল্য আমার বর যেন আমাকে পেল একদম র‍্যাপিং পেপারে মোড়া কোন বস্তু মনে করে তার নিজের কথা আর স্বাদ মিটানোই যেন প্রথম কথা। আমার কি হল আমি কি পেলাম সেটা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা ছিল না।

বরের সখ মিটিয়ে ঘুম থেকে উঠতে মাঝে মাঝে আমার অনেক দেরি হয়ে যেত। আর তারজন্য অনেক কথাও শুনতে হত। আমি রান্না-বান্না জানতাম না এইজন্য আমাকে কম কথা শুনতে হয় নাই। ধীরে ধীরে যখন সব গুছিয়ে নিলাম আর বিয়ের ৩ মাস পুর্ন হল আমার প্রথম প্রেগনেন্সি। আমার বর আর আমি অনেক খুশি কিন্তু আমার শাশুড়ি রাজি না কারণ ছেলের ইনকাম মাত্র ৩০ হাজার টাকার মত তারা নিজেরা ছেলের টাকায় চলে তার নিজের ছোট মেয়ে আছে এরমধ্যে নতুন কাওকে এনে নতুন খরচ হতে পারে না । গরিবের মেয়ে আমি বাপ কিছু দেয় নাই অন্য কোথাও ছেলে বিয়ে করালে আর কিছু না হোক একসেট ফার্নিচার পাওয়া যেত আমার বাবা তো তাও দিতে পারে নাই এমন কি তাদের কে একবেলা খাওয়ানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারে নাই। আমার কিন্তু কোন বউ-ভাত হয় নাই কারণ তারা সময় ম্যানেজ করতে পারেন নাই তবু আমার গরিব বাবা তাদেরকে কিছু হলেও একটা কমিউনিটি সেন্টারে খাওয়াতে তো পেরেছেন। এছাড়াও আমার শাশুড়ি আমাকে বলে দিল আমার মা কেমন মুর্খ যে সে আমাকে কোন কিছু শিখায় নাই উনি অনেক স্মার্ট তার কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে আগের থেকেই সব শিখায় নিসে। এই বাচ্চা নেওয়া যাবে না । আমাদের দুজনের খুব কষ্ট হলেও তাদের কথামত আমরা বাচ্চাটা এব্রোশন করে ফেলি। এরপর চাকরি সূত্রে আমার বর দিনাজপুর চলে যান আমাকে যেতে দেওয়া হয় না । এই বাড়ির বাধা কাজের লোক হয়ে যাই আমি। আর ওদিকে আমাকে শুনায় আমার বরকে বলা হয় চাইলে পেমটেম করতে পারে সে এইটা দোষের কিছু না। আর আমার বর ছুটিতে আসলে সারারাত তার মা-বোনের সাথেই গল্প আর তাদের আবদার মিটিয়ে ফুরসত পাইলে আমার কাছে আসতে পারে। এই সব করতে করতে দেড় বছর পার হল। একদিন মুখ ফুটে বলেই ফেললাম আমার মা হতে ইচ্ছে করে। আমাকে একটা সন্তান দাও। সে কথা রাখল।

এই কথা রাখার অপরাধে শুরুহল নতুন অত্যাচার আর আমার বর বলে দিল সে সন্তান চেয়েছে তাই নিতে হচ্ছে । এরমানে সন্তানের বাবা বলে যে দায়িত্ব আছে সেটা সে নিবে না। আমি আর আমার অনাগত সন্তান হয়ে গেলাম বোঝা আমাকে না যেতে দেওয়া হয় বাপের বাড়ি না আমাকে এখানে রাখতে চায়। আমার বরের সাথেও আমাকে ফোনে কথা বলতে দেওয়া হয় না। তিনিও ঢাকা আসা প্রায় বন্ধ করে দিলেন আর যখনই সুযোগ পায় তাকে আমার দোষ বলেই যান। এদিকে সময় এসে গেল হসপিটালে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সমাজের মুখ দেখানোর জন্য আমাকে নিয়ে আমার শাশুড়ি আসলেন। আমার কোলে আসল আমার সাদাত” আমার ছেলে। আমার শাশুড়ির কি খুশি যে ছেলে হয়েছে। সাদাত এর বাবা আসলেন ছেলে দেখে কেঁদেই ফেললেন আমার কাছে মনে হল সব স্বর্গীয় কিন্তু এই অনুভূতি ১ সপ্তাহের বেশি থাকল না। ছেলের এত খরচ তিনি দিতে পারবেন না আমার বাবাকে দিতে বললেন। আমার শাশুড়ি আমাকে আমার ছেলের কাছে বেশি থাকতে দিতেন না কারণ আমি কাজ করতে পারব না তাই এই অত্যাচার আর সব সহ্য করতে না পেরে ৬মাস পরে মুখ খুললাম। বর এসে বাবার বাড়ি রেখে দিল ছেলে ছোট তাই আমার কাছে বলে দয়া করে রাখল। ঐ বাড়ি থেকে বের হবার সময় থেকেই জানি আর ফেরা হবে না হল তাই। আমার বড় খালার মেয়ে জামাইয়ের অফিসের রিসিপ্সশনিশটের কাজ নিলাম। শাশুড়ি বলে বেড়াতে লাগল শরীর বেচে খাই। আবার এদিকে আমি ঈদের গিফট দিলে তা নিয়ে পড়তে বা সমালোচনা করতে দ্বিধা করে না।

বরকে জানালাম আমাকে নিয়ে যাবে কিনা দিনাজপুর উত্তর দিল অন্য মানুষের সাথে মুখে রঙ মেখে কথা বলি তাই সে আমার মুখ দেখবে না আর ছেলেকেও নিবে না আমার জন্য যত সমস্যা। আমি সহজেই বলে দিলাম ঠিক আছে পেপার সাইন করে পাথিয়ে দিচ্ছি। মনে হয় এই ধাক্কাটা নিতে পারেন নাই । পরেরদিন ঢাকায় এসে অনেক বিচার করলেন আমার আমাকে আমার বাবা-মা এর সামনে মারলেন। তার মা এসে আমাকে বললেন যব মেনে ঠিক হয়ে যাবে আমাকে চাকরি ছারতে হবে। আমি জানালাম আমি ১মাস সময় চাই। এই ১মাসে আমি ঘর খুঁজে বের করলাম চাকরি ছাড়ার বদলে অনাদেরকেই ছেড়ে দিলাম। আমার নিজের বাবা-মা মানতে পারেন নাই আমার বর আমার আর মুখ দেখেন নাই ছেলেকেও পরিচয় দিবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। আমি এখন হাসি আমার অনেক হাসি পায় আজ তারা আমার জন্য কি কি স্যাক্রিফাইস করেছে আর আমি কত খারাপ বলে বেরান আমার কিছু বলার প্রয়োজন হয় না আমার কারো কথা শোনার প্রয়োজন হয় না ।

এখন আমি আমার ছেলেকে নিয়ে আমার নিজের ঘরে আমার মত করে থাকি কোন কষ্ট নেই অভিযোগ নেই কোন হতাশা নেই। ডিভোর্সি মেয়েদের তো সম্মান কেও দেয় না আমার সম্মানের দরকার নেই আমার শুধু একটি ঘরে আমার সন্তানকে নিয়ে নিজের মত করে জীবন কাটিয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছুই দরকার নাই। আমরা মেয়েরা সারাজীবন কি পেয়েছি কি পাইনি এই হিসাবে আর যেতে চাই না। এখন আমি নিজে কি করতে পারি সেইটা নিয়েই ভাবতে চাই। আমি আমার সন্তানকে মানুষ করতে চাই। যাতে সে অন্য মানুষকে সম্মান দিতে শিখে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক