অনুরণন

বাবার রাজকন্যা

রাজবাড়ির বিশাল দীঘি যেখানে ছোট ছোট নৌকা বাধা থাকত সবসময়, সেই দীঘির পাড়ে এক বাড়িতে উঠলাম আমরা। জানালা দিয়ে তাকালেই জলরাশি আর রাজবাড়ি চোখে পড়ে। মনটা ভরিয়ে দেয়। সৌন্দর্য দেখার আগেই চাকুরিতে যোগদান করতে হলো। নতুন শহর প্রথম চাকুরি সব মিলে একটা ভয় তো ছিলোই সব সময়। সে ভয় আরো বেড়ে গেলো বড় বড় কিছু দায়িত্ব আমাকে দেওয়ার জন্য। সেখানে সবাই একই বয়সী হওয়ার কারনে বন্ধুত্বে কোন ঘার্টতি ছিলনা । খুব মজা করে প্রতিটা দিন কাটতো আমাদের। আমদের হাসিতে ম্যানেজার সাহেব মাঝে মাঝে মুখ কালো করে রাখত, কখনও কখনও অকারনে ডেকে তার সামনে বসিয়ে রাখত আমাদের দল ছুট করার জন্য । জামাই আমার প্রতি ঘন্টায় ফোনে খোজ নিত, সেটা দেখে কত কে যে কত হাসাহাসি করত। অচেনা শহরে নিজের কেউ ছিলনা তাই আমরা দুজন দুজনের বন্ধু ছিলাম। মাঝে অনেকটা দিন পেরিয়ে গেছে সবাই বলছে এবার আর কারো আসা চাই, সে বলে ভেবনা যদি কেউ না আসে তাতে আমার কোন দু: খ হবেনা শুধু তুমি থেকো পাশে। তবে আমি তো জানি সত্যি টা কি। এর মাঝে আমাদের সেই ইচ্ছা পুরনের পথে আলো দেখতে পেলাম। অফিসের কাজের চাপ তার পর সাংসারিক কাজ এর মাঝে অসুস্থ হয়ে গেলাম। ছোট্ট শহরের সব চেয়ে ভাল ডাক্তারের কাছে ছুটলাম সন্ধায় । ডাক্তার যা বললো তার সহজ কথা কচু পাতায় ১ ফোটা পানি যেমন,যখন তখন পড়ে যেতে পারে তেমনি আমার বেবী। কষ্ট মনে তবুও ওকে বলছি ভেবোনা তুমি। সেও বলছে আমাকে তুমি চিন্তা করো না। চিন্তা তো আমরা দুজনই করছি তবে কেউ কাউকে বুঝতে দিতে চাইছিনা। ডাক্তার ফিরিয়ে দিলো আর বললো রেষ্টে থাকতে। আমরা কষ্ট নিয়ে ফিরে এলাম। তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম চাকুরি ছেড়ে দিবো। আমার কাছে মা হওয়া টা সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার। চাকুরি টা যখন ছেড়ে দিলাম সবাই বলেছে ভূল করছো। আমি দ্বিতীয় বার ভাবার প্রয়োজন মনে করিনি । এর পর সারাদিন শুয়ে শুয়ে জানালা দিয়ে আকাশ আর ফুল দেখতাম । আমার জামাই এর কিছুই মনে থাকতো না, অথচ তখন সে নিয়ম করে ঔষধ খাওয়ানো, ঘরে অজু করার ব্যাবস্তা ঘরে বসে খাওয়ানো কোন কিছুতেই ধয্যহারা হয় নি। আর কি ভাবে আমাকে ভাল রাখা যায় সেই চেষ্টাই ছিলো সবসময় তার। ৫ মাস যখন আমি ডাক্তারের কাছে জানতে চাইলাম কি হবে, উনি প্রথমে বলতে চাননি আমার জোরাজুরিতে জানালেন মেয়ে। সত্যিই সেদিন ওর আনন্দ দেখে ডাক্তার ও অবাক হয়েছিলেন। সেদিন থেকেই শুরু করলো ওর রাজকন্যার জন্য কেনাকাটা। কয়েক দিনের মধ্যে ঘর ভরে গেল প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় সব দিয়ে। তুমি আর অপেক্ষা করতে পারছিলেনা রাজকন্যাকে দেখার জন্য। যে দিন সে পৃথিবীতে এলো সেদিন আমি তোমার আনন্দ দেখেছি। আজ ওর বয়স চার বছর, বাবা ছাড়া তার পৃথিবী শূন্য। বাবা তার বন্ধু। বাবা কোথাও গেলে বাবার ব্যাগে তার খেলনা উঠিয়ে দেয় যেনো বাবা তাকে মিস না করে। বাবার বালিশটা ধরে ঘুমায়। যেনো সে জানে বাবা তাকে পাবার জন্য কতটা ব্যকুল ছিলো। আমিও তো আমার বাবার এমই প্রিয় ছিলাম। বাবা রাতে নিজে না খাওয়ালে পেট ভরতো না। রাতে হাত টিপে না দিলে ঘুমাতে পারতাম না।খাবারের পর বাবা হাত ধুয়ে না দিলে হাত ধোয়া মনমতো হতো না। এমনই বুঝি হয় বাবা – মেয়ের সম্পর্ক। মেয়েরাই পারে বাবার রাজকন্যা, সন্তানের মমতাময়ী মা, আর যত ভালোবাসার সম্পর্ক আছে সেগুলো ধরে রাখতে।

লিখেছেনঃ সাজিয়া আফরিন