মুক্তধারা

একটি ফুলের শুকিয়ে যাবার গল্প

আজ ফুলের বিয়ে। অনেক দূরে বিয়েটা হচ্ছে। তবে তার মা বাবার ভাবনা নেই কারন যার সাথে বিয়ে হচ্ছে সে নাকি ফুলের ভালবাসার মানুষ। মধ্যবিত্ত বাবা নিজের যতটুকু ক্ষমতা, করেছেন।

ছেলের পরিবার ভাল। ছেলের বাবা নিজেই বিয়েতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। নিজেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। শুধু ফুলকেই তাদের চাই, আর কিছুই না। শিক্ষিত পুত্রবধু পরিবারে আলো ছড়াবে।  ওকে কিছুই করতে হবে না। শুধু বাসায় থাকবে। বাকি পড়াশুনাটা বউ আমার বাড়িতেই সম্পন্ন করুক। বাবা তাই নিশ্চিত। সব সপ্নকে পাশ কাটিয়ে আজ ফুলের বিয়ে। তবুও মনের মাঝে দু:খ মেয়ের পছন্দের বিয়ে। যাই হোক অবশেষে বিয়েটা হয়েই গেলো।

বিয়ের ২ বছর পর ফুলের সাথে আমার দেখা। বিয়ের পর থেকেই নাকি ফুলের পৃথিবীটা অন্য রকম হয়ে গিয়েছিলো। জিজ্ঞাসু  দৃষ্টিতে যখন তাকিয়ে ছিলাম ফুলের দিকে, সে বলতে শুরু করলো এইভাবে, তার স্বামী নাকি বলেছে ছেলেদের বেশি শ্বশুর বাড়ি যেতে নেই। এতে নাকি জামাই আদর কমে যায়। স্বামীটি তার পরিবার এবং বন্ধুদের সামনে বলতো ফুলের মায়ের রান্না ভালো না। তাই বেচারা ফুলদের বাসায় যায় না। এই কথাও লোকটি নিজের মা’কেও খাবার টেবিলে বলেছে। একবার ফুলের দেবর ফুলের মায়ের সামনে বলে বসলো, “আন্টি, ভাইয়া বলে আপনার রান্না ভালো না, আমার তো আপনার রান্না খুব ভালো লাগে।” ফুলের সামনেই তার মা’কে নিয়ে নানা কথা বলতো। ফুলের সবার সামনে কান্না পেত। কষ্ট হতো তার মাককে নিয়ে কি বলছে এরা ! ফুলের দৃষ্টি তার স্বামী নামক নায়কের দিকে, লোকটি সবার সাথে এক হয়ে গলা মিলিয়ে হাসছে।

আর বিয়ের পর মেয়েদের বাবা বাড়িতেও যাওয়ার দরকার নেই, এটা ছিল প্রতিদিনকার কথা। কথাগুলি আমার বিশ্বাস হলো না। কি বলে এই মেয়ে। আর কি অবস্থা জানতে চাইলাম, যা শুনলাম তা হলো, বিয়ের প্রথম মাস থেকেই প্রেশার দিচ্ছে ফার্নিচারের জন্য। আমার আগের কথা মনে পড়ে গেলো। ছেলের বাবার তো নাকি কোন চাহিদা ছিল না ! তার ৩-৪ মাস পর থেকে নাকি স্বামীটি টাকা দাবি শুরু করেছে। মনে হল যেন আমি আকাশ থেকেই পরেছি। স্নাতক শেষ করা এই মেয়ে এখন স্নাতকোত্তর করছে সে কিনা এসব বলছে। তার উপর পছন্দের বিয়ে! অবাক করা কথা তার পড়াশুনা করতেও বাধা দিয়েছিল। কিন্তু ফুল যে প্রতিবাদ করতে পারে তা তো ওই লোকটির জানা ছিল না। ফুলের মাকে সরাসরি বলেছিল, ও চাকুরীর করার দরকার নেই, আর চাকুরী যেহেতু করবে না তার মাস্টার্স পরীক্ষাও দেয়ার দরকার নেই।

আমি মুখ ফুটে বলেই ফেলেছিলাম তুমি কি প্রেম করে বিয়ে করেছ! এমন একটা ছেলের সাথে তোমার বিয়েটা হলো কি করে? কিছুই বুঝোনি! রাগে আমি তখন কাপঁছি। অবাক করে দিয়ে বলল তার গুণধর স্বামী তাকে না বলেই বিয়ের গহনা যা মোহরানার উসুল হিসেবে দেখানো হয়েছিলো নিজ দায়িত্বে বাবার হাতে তুলে দিয়েছে ঋণ শোধের জন্য ! আর তার চাইতে গুণধর শ্বশুর মশাই গহনা নিয়ে সোজা জুয়েলারি দোকানে। দাম আসলো ৯৬০০০ টাকা !  যা বানানোর সময় খরচ দেড় লক্ষ টাকা। আমি মনে মনে ভাবলাম এই তাহলে পাঁচ লক্ষ টাকা উসুল! ফুলকে মনের কথাটা বললাম। ও অবাক করে দিয়ে বলল ওরা উসুল বেশি দেখাবে এটা আগেই বলেছে, আর এতে ওর পরিবারের সম্মতিও ছিল! কারন টাকা দিয়ে কি সুখ কিনা যায়? তাইতো, টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না। কিন্তু তোমার পরিবার ও যে তোমাকে ঠকাতে সাহায্য করলো তা ভেবেই হতাশ হলাম। আল্লাহর দেয়া অধিকারটুকুও আমরা ছেড়ে দিয়ে চলে আসি। আমরা দয়াবান, আমরা নারী, আমরা মেয়ের পরিবার। কি সুন্দর ভাবে নিজেদেরকে পুতুল করে দেই।

এবার অবাক হবার পালাটা শেষ হলো আমার। কারন আমার বুঝতে বাকি রইলো না এরা অন্য জগতের মানুষ। আর এই বোকা মেয়েটি প্রেমে অন্ধই ছিল। আমি মেয়েটাকে যতটুকু বোকা ভেবেছিলাম সে ঠিক ততোটা বোকা নয়। সে সব কিছুই তার পরিবারকে জানিয়েছিলো। শুধু তাই নয় নিজের বাবার দেয়া গহনাগুলো তারপরই সে স্বামীকে না বলেই বাপের বাড়ি নিয়ে এসেছিলো। সে বুঝতে পেরেছিলো কালো হাত তার বাবার দেয়া অতি কষ্টের গহনাদির উপর পরবে।

জানতে চাইলাম তার প্রতি তার স্বামীর ব্যবহারের কথা। যা ভাবছিলাম তাই জবাব দিল। ব্যাপারটা মারামারি পর্যন্ত গিয়েছে। তার শ্বশুরী বলেছেন, আমার ছেলেকে রাগের কথা বলো না। স্বামীই মারবে আবার স্বামীই আদর করবে!

আমার শুনতে ভালো লাগছিলো না। ঘটনাটা খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। ধৈযের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করলো যখন তার স্বামীর পরকিয়ার কথাটা বলল। ফুল বলেছিলো, ” অনেক চেষ্টা করলাম। আর পারব না। এতো দিন অনেক ছোট বড় ঘটনা নিয়ে ভাবিনি, কারন ভেবেছি ঠিক হয়ে যাবে। বিয়ের পর বেশিরভাগ সময় বাবা মার কাছে কাটিয়েছি। তাও ভেবেছি ওকে ছাড়া বাচবো না। কষ্ট হলেও আমি ওকে ধরে রাখবো। আর হলো কই।” হা ফুল আর মেনে নিতে পারেনি।

ফুলের স্বপ্নগলো ভেঙ্গে গেলো। আমার প্রশ্ন এর জন্য দায়ী কে? ফুল নিজে? নাকি তার স্বামী? নাকি এই সমাজ? আমরা কেন আমাদের লোভগুলো কে নিয়ন্ত্রন করতে পারি না? কেন আমরা মেয়েরা সচেতন হই না? কেন আমরা একটা সুন্দর সম্পর্ককে মিথ্যা দিয়ে শুরু করতে যাই? কেন অন্যের মেয়ের সাথে অন্যায় করার আগে নিজের মেয়ের কথাটা ভাবি না? আমরা কি মনুষ্যত্ববিহীন হয়ে পড়ছি? একটি মেয়ের পরিবারকেই কেন ‘কনসিডার’ করতে হবে?

আমাদের সমাজে এখনো বহু মেয়ে আছে তার বিয়ের পরে কি কি হয় তার সাথে তা তার পরিবারকে জানায় না। যেটা একটি ভুল কাজ। মেয়েদের উচিত তাদের প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায়গুলো কাছের মানুষদের জানানো। ফুলের জীবন অন্য রকম হতে পারতো। হয়তো খুব খারাপ কিছু। কিন্তু সে তা হতে দেয়নি। সে প্রতিবাদ করেছে। নিজের সাথে অন্যায় হতে দেয়া উচিত নয়। আপনি ছেলে হোন আর মেয়ে হোন, অন্যায় কারো সাথে কাম্য নয়।

ফুল অবশ্যই একটি ছদ্মনাম। তবে বলা সব কথাই সত্য। সেই সমাজের আশা করি, যে সমাজে আর কোন মেয়ে অন্যায়ের স্বীকার হবে না। মেয়েরা হার মেনে ভাগ্যকে মেনে মুখ বুজে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিবে না। ফুলের মত ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করে যাবে, নিজেকে সম্মান করতে শিখবে।

আমি নারী, আমি পুতুল নই।

লিখেছেনঃ (নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক)