অনুরণন

বিভ্রান্তি

 

 “চৌধুরী এবং ইসলাম, ব্রোকারস”  অফিসে ঢোকার প্রধান দরজায় বেশ বড় করে শব্দগুলি লেখা, চোখ এড়ানোর উপায় নেই। প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে। সব কর্মচারী ইতোমধ্যেই চলে গিয়েছে। খোলা জানালা দিয়ে হঠাৎ গরম একঝলক হাওয়া ঢুকল, বাতাসটা গা না জুড়িয়ে বরং আরও একটু পুড়িয়ে দিয়ে গেল।

 

চৌধুরী সাহেবের বয়স পঞ্চাশ বছরের মত হবে। তিনি বেশ মোটাসোটা এবং জুয়া খেলতে খুবই পছন্দ করেন। হাসিখুশি এই মানুষটি কৌতুক করতেও বেশ ভালোবাসেন।

 

“বুড়ো বয়সে এই অসহ্য গরমে কিছুই করতে ভালো লাগে না,” তিনি বললেন। “তোমরা জোয়ান মানুষ তোমাদেরই এখন মজা করার সময়। চাঁদের আলো দেখবে, গান শুনবে, বান্ধবীদের নিয়ে বেড়াবে, দুহাতে টাকা কামাবে। কি চাই আর”।

 

ইসলামের বয়স ঊনত্রিশের কাছাকাছি। সে রোগা পাতলা, গম্ভীর, সুদর্শন এক যুবক। চৌধুরী সাহেবের কথা শুনে সে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

 

“হ্যাঁ, আমরা সব সময় মজার উপরেই আছি”, ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে বলল সে।

 

হঠাৎ একজন মানুষ বাতাসের গতিতে ঢুকে চৌধুরী সাহেবের পাশে এসে দাঁড়ালো।

 

“আমি মেয়েটির ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি,” আগন্তুক রহস্যময় ভঙ্গীতে ফিসফিস করে বলল। তার  বলার ভঙ্গিই বলে দিল সে একজন গোয়েন্দা।

 

চৌধুরী সাহেব তার দিকে স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, যেন তিনি হতবাক হয়ে গিয়েছেন। এই সময়ের ভিতরে ইসলাম তার কাগজপত্র গুছিয়ে, চুল আঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল। চৌধুরী সাহেবকে সালাম জানিয়ে সে বের হয়ে গেল।

 

একজন দর্শকের প্রস্থান হওয়ায় আগন্তুক যার পর নাই হতাশ হয়ে বলল, “এই যে ঠিকানা”।

 

ঠিকানা লেখা কাগজটা চৌধুরী সাহেব হাতে নিলেন। সাদা কাগজের উপর জেল পেনের গাঢ় নীল কালি যেন ফুটে উঠেছে।

 

“এক সপ্তাহ আগে সে এই ঠিকানায় এসেছে,” গোয়েন্দা বলল। “আপনি যদি আরও খবর চান আমাকে বলতে পারেন। এই শহরের সেরা প্রাইভেট ডিটেকটিভদের মধ্যে আমি একজন। যেকোন খবর আমি চোখের পলকে বের করতে পারি। প্রতিদিনের জন্য আমাকে এক হাজার করে টাকা দিলেই চলবে। আমি রোজ রাতে আপনাকে টাইপ করা রিপোর্ট দিতে পারবো। কোথায় কত খরচ হয়েছে…”

 

“নাহ, তোমাকে আর প্রয়োজন নেই” চৌধুরী সাহেব বাঁধা দিয়ে বলে উঠলেন। “এটা ওরকম কোন কেস না। আমার শুধু ঠিকানাটাই দরকার ছিল। তোমাকে কত দিতে হবে?”

 

“একদিন কাজ করেছি,” ম্লান গলায় আগন্তুক বলল, “এক হাজার টাকা দিলেই হবে”।

 

চৌধুরী সাহেব টাকা দিয়ে তাকে বিদায় দিলেন। অফিস থেকে বের হয়ে তিনি নিজেই গাড়ি বের করলেন, ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিয়েছেন। ঠিকানা খুঁজে তিনি যেই গলিতে ঢুকলেন সেটা একটা সরু গলি, ড্রেন থেকে পঁচা পানির গন্ধ আসছে এবং বাড়িঘর দেখে মনে হচ্ছে সেই প্রাচীনকাল থেকে যুদ্ধ করতে করতে এখনও টিকে আছে।

 

গাড়ি থামিয়ে বেশ কিছুদুর হাঁটতে হল চোধুরী সাহেবের। তারপর ঠিকানা মিলিয়ে যেয়ে বাড়িটি পেলেন সেটা এই এলাকার অন্যান্য বাড়ির তুলনায় বেশ নতুন। তিনতালা বাড়ি, গেটের উপর সস্তা নেইমপ্লেটে বাড়ির নাম লেখা “বহ্নিশিখা”। বাড়ির সামনে উঠানের মত জায়গায় দড়ি টানিয়ে রাজ্যের জামা কাপড় নেড়ে রাখা হয়েছে, এক কোনে স্তুপ করে রাখা শ্যাওলা পড়া কয়েকশ ইটের পিছন থেকে একটা ছাতিম গাছ উঁকি দিচ্ছে।

 

এসব ছাড়িয়ে এসে চৌধুরী সাহেব ভিতরে ঢুকলেন। দ্বিধামিশ্রিত পায়ে তিনি সিড়ি ভেঙ্গে উঠতে লাগলেন। তার বুক ধুকধুক করছে। তাও তিনি এমনভাব করতে চেষ্টা করলেন যেন তিনি পুরনো কোন বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন। যদিও তিনি জানেন না সে তাকে বন্ধু হিসাবে নেবে নাকি শত্রু হিসাবে!

 

তিনতালায় উঠে দরজায় ধাক্কা দিতেই স্বপ্না এসে দরজা খুলে দিল। তিনি ঢোক গিললেন। স্বপ্না কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে একপাশে সরে গেল। তিনি ভিতরে ঢুকলেন। স্বপ্না তাকে অবাক করে দিয়ে হাসল, সবসময়ের মত উজ্জ্বল প্রানোচ্ছ্বল হাসি। জানালার পাশে একটা চেয়ার দিয়ে তাকে বসতে বলল। চেয়ারটা নড়বড়ে, মনে হচ্ছে অনেকদিন ধরে বহু অত্যাচার সহ্য করেছে এটা।

 

কথা শুরু করার আগে চৌধুরী সাহেব স্বপ্নার মুখের দিকে তাকিয়ে তার চেহারা জরিপ করে নিলেন দ্রুত। তিনি মনে মনে নিজেকে বললেন তিনি সঠিক মেয়েকেই পছন্দ করেছেন।

 

স্বপ্নার একুশ বছর বয়স। একদম খাঁটি বাঙ্গালী মেয়ে বলতে যা বোঝায় স্বপ্না ঠিক তাই। তার একমাথা ঘন কালো চুল, এবং এই মুহুর্তে বিকেলের শেষ রোদে প্রত্যেকটি চুল যেন আলাদা আলাদাভাবে চমকাচ্ছে। তার গায়ের রঙ ততটা ফর্সা না, কিন্তু চোখদুটি এত গভীর যে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা হয়। তার শান্তশিষ্ট প্রকৃতি তাকে আরও অনন্যা করে তুলেছে। কিন্তু শান্ত হলেও সে দূর্বল না মোটেও, তার ভিতর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আছে, মাঝে মাঝে যেটা জ্বলে ওঠে।

 

“স্বপ্না”, চৌধুরী সাহেব তার দিকে সন্তুষ্টচিত্তে তাকিয়ে বললেন, “তুমি আমার চিঠির উত্তর দাওনি। আমি গত একসপ্তাহ ধরে তোমাকে পাগলের মত খুঁজছি। তুমি নতুন বাসায় উঠছ এটা আমাকে বলনি তুমি। তুমি কেন আমাকে এরকম অপেক্ষা করিয়ে রেখেছ? তুমি কি জানো না আমি তোমার সাথে দেখা করার জন্য, কথা বলার জন্য অস্থির হয়ে আছি?”

 

মেয়েটি স্বপ্নাচ্ছন্নের মত বাইরে আকাশের দিকে তাকাল।

 

“চৌধুরী সাহেব”, একটু দ্বিধা করে সে বলল, “আমি জানি না আপনাকে কিভাবে বলব। আমি আপনার প্রস্তাব ভালোভাবে ভেবে দেখেছি। আমি জানি আপনার কাছে আমি খুব ভালো থাকবো। কিন্তু, তারপরেও, আমি আসলে ঠিক জানি না আমি কি চাই। আমি ছোটবেলা থেকেই শহরে থেকেছি। এখন হঠাৎ করে একটা মফঃস্বলে থাকার কথা চিন্তা করতে ভয় পাই”।

 

“বোকা মেয়ে”, নরম সুরে তিনি বললেন, “আমি তোমাকে আগেই বলেছি যে তুমি যা চাইবে আমি তার সবকিছুই তোমাকে দিব? তোমার যখন ইচ্ছা তখন তুমি শহরে আসতে পারবে, যা খুশি কিনতে পারবে। চাইলে তোমার বান্ধবীদের সাথে দেখা করতে পারবে। আমার উপর তোমার বিশ্বাস আছে, আছে না?”

 

“পুরোপুরি”, সে বলল, তার বড়বড় চোখ মেলে তার দিকে তাকিয়ে সে হাসল। “আমি জানি আপনি খুব দয়ালু, আপনার কাছে যে মেয়ে যাবে সে ভাগ্যবতী। আমি যখন সালমা ম্যাডামের কাছে ছিলাম তখন আপনার কথা অনেক শুনেছি”।

 

“আহ!”, চৌধুরী সাহেব তৃপ্তির সাথে হাসলেন। “আমার এখনও মনে পড়ে সেদিন সন্ধ্যার কথা। সারাটা সন্ধ্যা সালমা তোমার প্রশংসা করেছিল। আর তোমাকে দেখার পরে আমি বুঝেছিলাম সালমা কতটা কমিয়ে বলেছে। আমি ওইরাতের ডিনারের কথা কখনও ভুলবো না। স্বপ্না, আমার বাড়িতে চলো তুমি। আমি কথা দিলাম তোমাকে এর চেয়ে ভালো আর কেউ রাখবে না। তুমি আমার বাড়িতে আসলে কখনও আফসোস করবে না”।

 

মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেঝের দিকে তাকাল। হাতগুলি তার বুকের কাছে জড়ো করা, যেন নিজেই নিজেকে জড়িয়ে ধরেছে।

 

হঠাৎ চৌধুরী সাহেব সচেতন হয়ে উঠলেন।

 

“বল স্বপ্না”, তিনি ব্যাকুল স্বরে বললেন, “আর কেউ—আর কেউ কি আছে?”

 

স্বপ্নার গাল আর চিবুক লাল হয়ে উঠল।

 

“আপনার এটা জিজ্ঞেস করা উচিৎ হয়নি, চৌধুরী সাহেব”, সে বলল। “কিন্তু আমি আপনাকে সত্যি কথা বলতে চাই। আরেকজন আছে— যদিও আমি তাকে কোন কথা দেইনি”।

 

“তার নাম?” রাগত স্বরে জানতে চাইলেন তিনি।

 

“সাগর”।

 

“শাহরিয়ার সাগর!” চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। “সে কিভাবে তোমার কাছে এলো? আমি তার জন্য এত কিছু করার পরেও—”

 

“ওহহ! তার মোটরসাইকেলের শব্দ পেলাম মাত্র। সে এখানেই আসছে,” জানালা দিয়ে নীচে তাকিয়ে স্বপ্না বলল। “সে উত্তর চাইতে আসছে! ওহ, আমি জানি না আমি কি বলব”।

 

দরজায় ধাক্কানোর শব্দ শোনা গেল। স্বপ্না দরজার দিকে যাওয়া শুরু করতেই তিনি স্বপ্নাকে আটকালেন।

 

“তুমি এখানেই থাকো। আমি দেখছি”।

 

সাগর চৌধুরী সাহেবকে দেখে থমকে গেল। তাকে এ সময় সে এখানে আশা করেনি।

 

“চলে যাও”, দাঁতে দাঁত চেপে চৌধুরী সাহেব ফোঁস করে উঠলেন।

 

“আপনার কথায় আমি কেন যাবো” সাগর প্রায় তেড়ে এসে বলল।

 

“চলে যাও,” তিনি আবারও বললেন, “তোমার কি এই শহরে থাকার ইচ্ছা চলে গিয়েছে? তুমি আমাকে চেন। আমি তোমাকে খুন করে ফেলব”।

 

স্বপ্নাকে চাইলেও সাগরের সাহস ছিল না চৌধুরী সাহেবের সাথে শত্রুতা করার। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বের হয়ে গেল। সিড়ি থেকে নামার সময় সে গজগজ করছিল। চৌধুরী সাহেব

দেখেও না দেখার ভান করলেন। তিনি আবারও স্বপ্নার কাছে গিয়ে দাড়ালেন।

 

“স্বপ্না” কর্তৃত্বের সাথে তিনি বললেন, “তোমাকে আমার লাগবেই। আমি আর কোন কথা শুনতে চাই না। তোমাকে আর সময়ও দিতে পারছি না”।

 

“আমাকে কখন চান আপনি?” সে জিজ্ঞেস করল।

 

“এখন। যত দ্রুত তুমি তৈরী হতে পারবে”।

 

সে চৌধুরী সাহেবের চোখের দিকে তাকাল।

 

“আপনি একবার ভেবে দেখেছেন, শরীফা সেখানে থাকা অবস্থায় আমার কি ওই বাসায় যাওয়া ঠিক হবে?”

 

চৌধুরী সাহেব থমকে গেলেন। তিনি অযথাই টাইয়ের নট ঢিলা করে আবার টাইট করলেন।

 

“সে চলে যাবে,” গম্ভীরভাবে তিনি বললেন। “ওই মহিলাকে আমি আর সহ্য করতে পারছি না। সে আসার পর থেকে একদিনও আমি ভালো থাকিনি। তুমি ঠিক বলেছ, স্বপ্না। তোমার আসার

আগেই শরীফা আমার বাড়ি থেকে যাবে। তার যেতেই হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আমার দরজা তার জন্য বন্ধ”।

 

“আপনি কখন তাকে যেতে বলবেন?” সে জিজ্ঞেস করল।

 

“আজ রাতেই। আজই আমি তাকে পাঠিয়ে দেব”।

 

“তাহলে আমার আর আপত্তি নেই”, স্বপ্না বলল। “আপনি আমাকে যেকোন সময় এসে নিয়ে যেতে পারেন”।

 

“আমাকে কথা দাও তুমি আমার সাথে আসবে?”

 

“আমি কথা দিলাম”, স্বপ্না নরম সুরে বলল।

 

চৌধুরী সাহেব খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তার নিজের সৌভাগ্যে তার বিশ্বাস হচ্ছে না।

 

“কাল”, সিড়িতে নামতে নামতে তিনি চেঁচিয়ে বললেন।

 

“কাল”, দরজায় দাঁড়িয়ে স্বপ্না হালকা স্বরে বলল।

 

দেড় ঘন্টা পরে চৌধুরী সাহেব নিজের বাড়ি এসে পৌঁছালেন। বিশাল এই বাড়িটা বানাতে তার কম খরচ হয়নি। বাড়ির সামনের বাগানেও যথেষ্ট পয়সা ঢেলেছেন তিনি। লনে ঢোকা মাত্রই শাড়ি পড়া এক মহিলা তার পাশে এসে দাড়ালেন। তার স্ত্রী।

 

তিনি যখন বাড়িতে ঢুকছেন তখন তার স্ত্রী বললেন, “আজ আমার মা এসেছেন। এখানেই রাতে খাবেন”।

 

তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পড়লেন।

 

“তোমাকে আমার কিছু বলার আছে,” চৌধুরী সাহেব বললেন, “ভেবেছিলাম রাতে খাওয়ার পর তোমাকে বলব। কিন্তু যখন তোমার মা এসেছেন, ব্যাপারটা তারও জানা উচিৎ”।

 

তিনি তার স্ত্রীর কানে কানে কিছু বললেন।

 

তার স্ত্রী চেঁচিয়ে উঠলেন। চৌধুরী সাহেবের বৃদ্ধ শাশুড়ি প্রায় দৌড়ে চলে এলেন চিৎকার শুনে। ভদ্রমহিলা আবার চিৎকার করলেন—এটা আনন্দের চিৎকার।

 

“ওহ, মা!” আনন্দে তার গলা কাঁপছিল। “স্বপ্না আসছে। স্বপ্না এখানে আমাদের রাঁধুনি হয়ে আসছে! সে গত বছর আমার বান্ধবী সালমার বাসায় ছিল। আর এখন…মা, আমি এক্ষনই রান্নাঘরে গিয়ে শরীফাকে বিদায় করে আসছি। অবশেষে আমরাও একটা ভালো রাঁধুনি পেলাম”।

 

(ও’হেনরীর ছোটগল্প “গার্ল” এর ছায়া অবলম্বনে)

লিখেছেনঃ সোহানা রহমান