মুক্তধারা

আমি কথন

আমার খুব ভালো লাগে ঝুম বৃষ্টিতে গাড়ির গ্লাসটা নামিয়ে দিতে। খুব বৃষ্টি হচ্ছে আর আমি গাড়ির গ্লাস নামিয়ে দিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিই। যদিও গাড়িতে অন্য কেউ থাকলে এটার জন্য বিশাল ঝাড়ি খেতে হয়। ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো লাগে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ। তাই হয়ত যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায়ই বৃষ্টি দেখলে খুব ভালো লাগে। খুব ছোটবেলাতেই পরিচয় হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদ, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীসহ আরো অনেকের সাথে। শুধু বই না। যেই সময়ে আমার বয়সের বান্ধবিরা কার্টুন দেখত আমি তখন দেখতাম ‘Children of Heaven’  । এখনও মনে আছে, মতিঝিলের মধুমিতা সিনেমা হলে যেয়ে আব্বু আম্মু খালামনি সবার সাথে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ সিনেমাটা দেখেছিলাম। যদিও সিনেমার আগা মাথা কিছুই বুঝি নি ওই বয়সে। তখন ওই একটাই এসি ভালো সিনেমা হল ছিল ঢাকায়। এরপর আব্বু আম্মুর সাথে আরও অনেকবার হলে যেয়ে সিনেমা দেখেছি। শুধু সিনেমা না, পিচ্চিকাল থেকেই শুনতাম মান্না দে, শ্রীকান্ত, আইয়ুব বাচ্চু। ছোট থেকেই এত কিছুর সাথে বড় হওয়ার পিছনের কৃতিত্ব বেশি তিনজন মানুষের। আব্বু আম্মু আর মামা। এই তিনজন আমাকে মেয়ে হিসেবে না পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে বড় করেছে। এরপর আস্তে আস্তে বড় হওয়া আর সাথে সাথে বই পড়া, গান শোনা আর মুভি দেখার নেশা বাড়তে থাকলো। এমনও হয়েছে নতুন বই কিনেছি কিন্তু কোন একটা পরীক্ষা চলছে। কিন্তু নতুন গল্পের বই না পড়ে থাকতে পারছি না। তাই কিছু ঘটনা সিরিয়ালি ঘটত। গল্পের বইটা সাথে নিয়ে ওয়াশরুমে যাওয়া এবং আম্মুর কাছে ধরা খাওয়া অবশেষে পিঠের উপর স্কেলের বাড়ি। তারপরও কখনই ওয়াশরুমে যেয়ে বই পড়া থেমে থাকে নি।

এরপর বড় হতে হতে আমার পৃথিবীটাও বড় হতে থাকলো। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি লাইফে সবকিছুই মনে হয় বেশি করেছি খালি পরালেখাটাই কম করেছি। ডিবেট ক্লাব, সায়েন্স ক্লাব, কালচারাল ক্লাব সবকিছুর সাথেই আমি ছিলাম। তাই বন্ধু বান্ধবিও ছিল অনেক। যদিও ক্লাস ফাইভে থাকতে ক্লাবে নাম লেখানোর পিছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল স্কুলের সবার কাছে পরিচিত মুখ হওয়া। কিন্তু আম্মু আর মামা হয়ত জানত যে এসব কিছুর সাথে সাথে শুধু পরিচিত মুখই না আমি অনেক অনেক কিছুর সাথে পরিচিত হতে পারবো। হয়েছিলও তাই। কতকিছু যে শিখেছি জেনেছি। কত বড় বড় মানুষের সানিধ্য পেয়েছি। কত কত বন্ধু জুটিয়ে ফেলেছি। আমার এখনও মনে আছে, ডিবেটিং ক্লাবের কোন এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জাফর ইকবাল স্যারের সাথে হাত মেলানোর পর আমি বাসায় এসে চামচ দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম হাত যেন ধুতে না হয় সেই জন্য। ইউনিভার্সিটি শেষ করেছি পাঁচ বছর। কিন্তু এখনও যখন কালচারাল ক্লাব এর জুনিয়ার ভাই বোন গুলো ফোন করে বলে আপু পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান অথবা এনুয়াল কালচারাল নাইট, আপনাকে আসতেই হবে। সেটা একটা অন্য রকম ভাল লাগা।

 

সবাইকে সারা জীবন বলতে শুনেছি যা মজা করার বিয়ের আগে করে নাও। বিয়ের পর মেয়েদের সব ঘুরাঘুরি আড্ডা বন্ধ হয়ে যায়। এক বছর হল আমার বিয়ে হয়েছে। সত্যি কথা বলছি আমার ঘুরাঘুরি আড্ডা লাইফটাকে এঞ্জয় করা সব আরও আরও বেড়ে গিয়েছে। যদিও ছোটবেলা থেকে অনেক স্বাধীনতা নিয়ে বড় হয়েছি কিন্তু আব্বুর থেকে সারা রাত স্টেডিয়ামে বসে গান শোনার পারমিশান চাওয়ার সাহসও হয়নি আমার। অথচ আমার সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে বিয়ের পর। সারা রাত জেগে ফোক ফেস্টিভ্যালে দেশি বিদেশি মিউজিশিয়ানদের দেখতে কেমন লাগে তা আমার হাজবেন্ডের কারনেই অনুভব করতে পেরেছি। ও আমাকে সব কিছুতে ইন্সপায়ার করে। গান শুনতে, মুভি দেখতে, আড্ডা দিতে, ঘুরে বেড়াতে, জব করতে, পড়ালেখা করতে, আর অনেক অনেক হাসতে। আমাদের আরেঞ্জ ম্যারেজ। আমাকে অনেক ছেলে বা তাদের মা বাবার পছন্দ করে নি একমাত্র এই কারনে যে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ শেষ করার পর আমার ইচ্ছা জব করার। অথচ আমার হাজবেন্ড আর আমার মা-বাবা তিনজনই চান আমি এমবিএ শেষ করার পর অবশ্যই যেন ঘরে বসে না থাকি। মা আমাকে সব সময় একটা কথাই বলেন, তোমার আব্বু আম্মু তোমাকে এত পড়ালেখা করিয়েছে, এত ভাল ভাল ইন্সটিটিউটএ পড়েছ কি ঘরে বসে থাকার জন্য? অবশ্যই ইন্ডিপিন্ডেন্ট হবা। আমি সত্যিই নিজেকে অনেক লাকি মনে করি। যেখানে রোজ আমাদের দেশের পেপারে নিউজ আসে হাজবেন্ড, শ্বশুর শ্বাশুরির কাছে মেয়েদের নির্যাতিত হওয়ার। সেখানে আমি এতো সাপোরটিভ একটা ফ্যামিলির মেম্বার।

আমি পৃথিবীতে সব চেয়ে বেশি ভালবাসি, সব চেয়ে বেশি ঝগড়া করি, কিন্তু সব চেয়ে কম কথা বলি আমার আব্বুর সাথে। আব্বুকে বেশি ভালবাসি বললে অবশ্য আম্মু রাগ করতে পারে। এখানে মনে হয় বাচ্চাদের মত টেকনিকালি বলা উচিত ছিল দুইজনকেই সমান ভালবাসি। আমার আব্বুর মনে হয় সারা জীবন একটাই চাওয়া ছিল, আমাকে আর আমার ছোট বোনকে ভাল জবে ভালো একটা পোস্টে দেখা। এই জন্য ছোটবেলা থেকেই আব্বুর কাছে আমাদের দুইজনের পড়ালেখা থেকে ইম্পরট্যান্ট আর কিছু ছিল না। পড়ার জন্য আব্বু সব স্যাক্রিফাইস সব কিছু করতে রাজি ছিল, এখনও আছে। আমি এখন এমবিএ করি অথচ এখনও আমার সিজিপিএ, গ্রেড, কোন সেমিস্টারে কি কোর্স, কি কি বারে ক্লাস সব আব্বু জানে। আমার মনে হয় না আর কারও বাবা এই কাজ করে। আগে খুব বিরক্ত হতাম এইসব নিয়ে। প্রেস্টিজে লাগত। কিন্তু এখন যত দি যাচ্ছে তত মনে হয় আব্বুর এই ভালবাসার মূল্য বুঝতে পারছি।

আমার ভিতরে এখনও কোথায় যেন একটা ছোট আমি রয়ে গিয়েছে। সেই ছোট আমিটা কখনও বড় হতে চায় না। খুব আলসে একটা আমি। যে একটু আল্লাদি, একটু দুষ্ট। যে হুট করে রেগে যায় আবার হুট করে রাগ পড়েও যায়। আর আমার এই ছোট আমিকে সব চেয়ে ভাল করে সামাল দেয় আমার হাজবেন্ড। রিদেন। আমার রাত বিরাতে হঠাত ঘুরতে যেতে চাওয়া, অসময়ে আইসক্রিম খেতে চাওয়া, রাত জেগে মুভি দেখতে চাওয়া, মুড সুইং হওয়া সব কিছুই কিভাবে যেন মানুষটা সামাল দিয়ে দেয়। আমাদের যেদিন প্রথম দেখা হয়েছিল অনেক আত্মীয়-স্বজনের মাঝখানে সেই দিনও ওর খেয়াল ছিল আমার চাওয়ার দিকে। ওয়েটার আমার সামনে স্প্রাইট দিয়ে চলে যাচ্ছিল আর আমি তখন ওয়েটারকে বলেছিলাম কোক দিতে। ওয়েটার সেটা খেয়াল না করেই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু আমার থেকে বেশ কিছুটা দূরে বসে থেকেও ও সেটা খেয়াল করেছিল। সাথে সাথেই ওয়েটারকে ডেকে বলল, ওইখানে কোক দিবেন। ছোট্ট একটা কেয়ারও যে অনেক কিছু মিন করে সেটা সেইদিনই বুঝেছিলাম। আমার ছোট ছোট চাওয়া, ছোট ছোট কষ্ট, সব কিছুর প্রতি যদি আব্বু আম্মুর পর কারো খেয়াল থাকে তাহলে সেটা এই মানুষটা।

আমাদের আসলে পথচলাটা খুব একটা কঠিন না যদি কাছের মানুষগুলোর সাপোর্ট থাকে। কাছের মানুশগুলো পাশে থাকলে তখন আর কোন কিছুই কঠিন মনে হয় না। যেদিন সবার ফ্যামিলিতে সব মেয়েদেরকে প্রাপ্য সম্মান আর সাপোর্টটা দেওয়া শুরু হবে সেদিন আর নারী দিবস এতো ঘটা করে পালন করার প্রয়োজন হবে না। সেদিন রোজই নারী দিবস হবে।

 

 লিখেছেনঃ নিশাত সাইফ বাধন