অনুরণন

হিরালাল

আওয়াজ তুলে কারুকারজিত ঘোড়াগাড়িটি দু’তালা বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ালো , আজ রবিবার তাই এই বাড়িটি জমজমাট , নিচে খদ্দেরদের ভীর , নিচ তলাতেই মদের দোকান আর খদ্দেরদের জন্য কামরা। দোতালায় বসে মুজরা বা বাইজীর আসর। যে বিশাল ঘরটি তে এই আসর জমে তার  দু’কামরা পরেই থাকেন বাইজী।

হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমেই মুখে রুমাল দিয়ে সামনের দরজা দিয়ে ঢুকলেন নওয়াব সাহেব , ইনি জমিদারের সব থেকে বিশ্বস্ত আর জমিদারীর সকল কিছু ইনিই দেখাশোনা করেন। কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা উঠে আসলেন জলসা ঘরে , বাইরে অনেকগুলো দামি স্যান্ডেল আর জুতা দেখা যাচ্ছে এবং কি তিন জোড়া ইংরেজ সাহেবদের জুতাও দেখা যাচ্ছে। এই জলসা ঘরে বাইজীর গান শুনতে আর মুজরা দেখতে পঞ্চাশ টাকা করে দিতে হয় । এছাড়াও তো বকশিসের ফোয়ারা আছে যে যত দিতে পারে তার তত খাতির, তাই এখানে সব রাখব-বোয়ালদের আসা যাওয়া। নওয়াব সাহেব সরাসরি কারো তোয়াক্কা না করে ঢুকে পড়লেন।

মেঝের চতুর্দিকে বসার জায়গা যার সামনে  দামি বিলিতি মদ , গাজা, খাবার দিয়ে পরিপূর্ণ। বিশাল ঝাড়বাতি টির নিচে মুজরা দেখাচ্ছেন একটি অল্প বয়সী মেয়ে আর তার ঠিক ডানে একটু উঁচু স্থানে বসে গান গাচ্ছেন বাইজী তার দু’পাশে বসে আছে বাদ্যবাদকেরা। নওয়াব সাহেব সরাসরি বাইজীর সামনে এসে দাঁড়ালেন ,আসর থেমে গেল , কিছু বুঝা যাচ্ছে না কি ব্যাপার, থমথম করছে সবার মুখ, ইংরেজ সাহেবরা মুখ উঁচু করে দেখছেন ঘটনা কি হয়, বাইজী হঠাত করে উঠে দাঁড়ালেন এবং নওয়াব সাহেবের সাথে নেমে এসে গাড়িতে চড়ে বসলেন। গাড়ি এগিয়ে চলল আর জমিদারের গাড়ির পিছনেই ছুটল আর একটি ঘোড়াগাড়ি -বাইজীর নিজের গাড়ি।

জমিদার বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামতেই নেমে আসলেন নওয়াব সাহেব আর বাইজী সরাসরি উপরে উঠে যাচ্ছেন তারা জমিদারের ঘরে , আশে-পাশে ফিসফাস আওয়াজ শুরু হয়ে গেল উচ্চ ও নিচু সরে কেও কেও গালি দিলেন বাইজীকে।

জমিদারের ঘরে আসার পরেই জমিদার বাবু হাত তুলে নওয়াব সাহেব কে বাইরে যেতে বললেন আর মুখ তুলে বললেন – “এসো, হীরা – এখানে এসো”।। হীরা বা হীরালাল বাইজী ঠিক যেন বর্ননাকৃত কোন গ্রীক দেবীর মত শরীর , কোমর পর্যন্ত কালো কোঁকড়ানো চুল , চিকন সুন্দর দাঁতের সারি আর পাতলা ঠোঁট, সুউচ্চ নাক, গভীর আর বিশাল দুটি কালো চোখ তারচে অধিক কালো তার গায়ের রঙ ঠিক কৃষ্ণ  দেবতার মত কালো রঙের মেয়ে এই হীরালাল -যাকে দেখে আর যার গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যান জমিদার। শুধু জমিদার বাবুই না আরও অনেক বাবুই হীরালাল এর গানের পাগল তাইত তার মাসিক আয় দু’হাজারের বেশি। কিছুক্ষণ পর হীরালাল বাইজী বের হয়ে আসলেন জমিদারের ঘর থেকে , নওয়াব সাহেব কে কিছু বললেন এরপর সোজা অহংকারী তেজী এক মেয়ের মত নেমে এসে নিজের গাড়িতে চড়ে বসলেন।

পরেরদিন সকালবেলা রুস্তম কে ডেকে পাঠালেন বাইজী, রুস্তম তার ঘোড়াগাড়ির চালক, তার দেহরক্ষী বা পালিত গুন্ডা যেটাই বলেন সেই একমাত্র পুরুষ এই বাড়িতে থাকেন যার অনুমতি আছে বাইজীর ঘরে আসার। রুস্তমের হাতে একটি পোটলা আর একটি চিঠি তুলে দিলেন বাইজী এরপর  তার পালিত মেয়ে জ্যোৎস্না আর নাতি কে নিয়ে গাড়ি করে চললেন ইংরেজদের স্কুলে। পাদ্রী কিছুতেই এই ছোট্ট মেয়ে কে স্কুলেভর্তি করাতে চাইছিলেন না তাই সঙ্গে করে এবার হীরালাল নিয়ে এসেছেন জমিদারের আদেশ পত্র। স্কুলের খাতায় পাদ্রী নাম লিখার সময় লিখেন ,মীরাবাঈ -জমিদারে পুষ্যি। অন্যদিকে ইংরেজদের স্কুল থেকে বাড়ির সামনে বাইজীকে নামিয়ে রুস্তম চলে আসলেন জমিদার বাড়িতে। প্রধান দরজার কাছেয় অপেক্ষা করছিলেন নওয়াব সাহেব তার কাছে পোটলা আর চিঠি তুলে দিলেন রুস্তম বাইজীর নির্দেশ মত।

এর ঠিক দুইদিনের মাথায় জমিদার বাবু রওনা হলেন নবাবের কাছে সাথে ছিলেন নওয়াব সাহেব তিনি তখন বাইজীর লিখা চিঠি পড়ছিলেন। এতদিন ধরে তার মনে হাজারো প্রশ্ন ছিল এরকম একটা কালো বিশ্রী মেয়ের প্রতি জমিদারের কেন এত দুর্বলতা আজ নিজে বুঝতে পারলেন। চিঠি পরা শেষে জমিদারের দিকে ঘুরে তাকালেন , জমিদার বাবু বললেনঃ “বুঝসো নওয়াব , এই কথা কাওকে বলা যাবে না কেও জানলে আর এর কদর তো করবেই না বরং ছি ছি করবে। নবাব কে বলতে হবে এইগুলো আমিই করতে চাই।”

নবাবের কাছ থেকে ফিরে এসে জমিদার জানতে পারলেন হীরালাল আগুনে পুড়ে আত্মহত্যা করেছেন, কয়লা রঙের মেয়ে পুড়ে নিজে কয়লা হয়ে গিয়েছে। এর একমাস পরে জমিদারের পুরো এলাকা জুড়ে শুরু হল সাজসাজ রব , মেয়েদের বাচ্চা হবার জন্য আলাদা করে ধাত্রী নিয়োগ করা হল তাদের জন্য দেয়া হল দুটি ঘোড়াগাড়ি যার একটি বাইজী ব্যবহার করতেন। পানির জন্য মাটির নিচে চৌবাচ্চা বানানো হল,রাস্তায় তেলের বাতি দেয়া হল, আশ্রয়হীন বাচ্চাদের জন্য হীরালালের বাড়িটি দেয়া হল , হীরালালের নিজেস্ব কিছু জমিতে বানানো হল স্কুল, মীরাবাঈ কে কলকাতার ইংরাজী স্কুলে দেয়া হল। সারা এলাকা জুড়ে জমিদারে উদারতা আর নবাবের গুন কীর্তন শুরু হল।

বছর চারেক পর একদিন জমিদার বুকের ব্যথায় মারা গেলেন, নওয়াব সাহেব সাথে সাথে বাইজীর চিঠি খানা পুরিয়ে ফেললেন। কেও কোনদিন আসল সত্যটা জানতে পারলেন না।  মীরাবাঈ এখন বেশ নামকরা গায়িকা এখন সে বায়স্কোপে গান গায়।

লিখেছেনঃ আনিকা সাবা