অনুরণন

এপিটাফ

 

এক

আমার মনে হচ্ছে, আমার মাথায় এই মুহুর্তে আকাশ ভেংগে পড়বে! আক্ষরিক অর্থেই মাথার উপরে সুবিশাল আকাশ ছাড়া কিছু নাই, তাই যদি ওপর থেকে কিছু ভেংগে পড়ার আশংকা থাকেই তবে আকাশই পড়ার কথা! তীব্র যন্ত্রনা হচ্ছে হাতে কষ্টে ব্যথায় চোখে জল এসে পড়ছে। কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না, আগুন গরম এই ইঞ্জিনের উপর কিভাবে পুরা একটা থাবা বসিয়ে দিলাম, পুরো হাত সাথে সাথে লাল হয়ে ফুলে ঢোল হয়ে গেল। প্রচন্ড যন্ত্রনা আর জ্বালাপোড়া চেপে ট্রলারের এক কোনায় চলে আসলাম। কাছের মানুষ ছাড়া সচরাচর কারো সামনে আমি কোন ধরনের আবেগ প্রকাশ করতে পারি না, তাই বোধহয় কাছের মানুষের উপর ডোজ টা একটু বেশি পড়ে যায়। যেমন, এখন এই মুহূর্তে হাতের ব্যথায় আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু পারছি না। আমি যাচ্ছি ছেঁড়া দ্বীপে, মাছ ধরার বড় ট্রলারে। ট্রলারে আমি সহ ৩৫ জন। ৩৪ জনের কাউকেই আমি চিনি না। তাই আমার বাধ্য হয়ে কান্নাটা গিলে ফেলতে হল! সমুদ্রের দিকে উদাস দৃষ্টি দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করছি। হঠাত পাশ থেকে একটা মেয়ের গলা, ‘আপু আপনার শরীর খারাপ লাগছে?’  আমি কোন মতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আমার ব্যাকপ্যাকের সামনের পকেটে পেট্রোলিয়াম জেলী আছে, একটু বের করে দিবেন?’ মেয়েটা আমার হাতে কৌটা টা দেবার সাথে সাথে আমি পোড়া হাতে মাখতে লাগলাম। আমার হাতের ভয়ানক অবস্থা দেখে আতকে উঠল ও। জিজ্ঞেস করল, ‘কী করে আপু?’ ইঞ্জিন দেখিয়ে বললাম, ‘হাত দিয়ে ফেলেছিলাম’ মেয়েটি জানাল, মাঝি নাকি বার বার সবাইকে নিষেধ করেছিল হাত দিতে! হায়, ৩৫ জন এর মধ্যে আমিই একমাত্র হতভাগা এবং বেকুব!

ছেঁড়া দ্বীপে নেমে আমি দৌড় লাগালাম সমুদ্রের দিকে, খুশিতে না। হাত টা পানিতে একটু ভেজানোর জন্য।প্রচণ্ড যন্ত্রনা হাতে। মাঝে মাঝেই দেখলাম মেয়েটা একা একা হেটে বেড়াচ্ছে।দৌড়াচ্ছে।লাফাচ্ছে। মুগ্ধ কিন্তু ক্যামন একটা বিষন্ন দৃষ্টি নিয়ে! প্রচণ্ড প্রানচঞ্চল, ছটফটে কিন্তু কোথাও কেমন একটা উদাসীনতা ওর চোখে মুখে!

কিছুতেই আমার কিছু লাগছে না। পোড়া হাতের যন্ত্রনায় আমি ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছিলাম! তখনও বুঝি নি, ‘পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরা দোস্ত!’ শেষ মেষ ছেঁড়া দ্বীপ থেকে এসে যখন শুনলাম, আজ কোন জাহাজ জেটিতে ভিড়বে না!! মানে ঢাকায় যাওয়া ক্যান্সেল আজ।আমার মাথায় এবার সত্যি পুরো আকাশটা ভেংগে পড়ল! কাল  আমাকে ঢাকায় থাকতেই হবে, একটা সেমিনারে এটেন্ড করার কথা। হন্ত দন্ত হয়ে যখন বুঝলাম আসলেই কিছু করার নেই তখন সাথে সাথে ফোন দিলাম রিসোর্টে, কোন রিসোর্ট খালি নেই!! কোথায় থাকব রাতে, কি করব কিছুই যখন বুঝতে পারছি না তখন খেয়াল করলাম, একটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে! মাথায় রক্ত উঠে গেল। ছেলেটার সামনে গিয়ে এক নিশ্বাসে বলে ফেললাম, ‘বেয়াদব ছেলে, মানুষের বিপদ দেখলে মজা লাগে? আনন্দ হয়? একটা চড় মেরে দাঁত ফেলে  দিব’ বলেই উল্টা ঘুরে হাটা দিলাম। পোড়া হাত রোদের তাপে প্রচণ্ড জ্বলছে, রাগে মাথাটাও ভোঁ ভোঁ করছে! কার মুখ দেখে যে সকাল টা শুরু হয়েছিল,সেটাও মনে করতে পারছি না!

 

দুই.

সমুদ্রের তীর ধরে হাটছি, হঠাত একটা বাচ্চার চিৎকার,’আপু আপু সামনে চোরাবালি আছে যে ‘। এসব বাচ্চাদের দেখলে আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেই, ইশ কী অনাদর-অবহেলায় বড় হচ্ছে! ওর সাথেও গল্প জুড়ে দিলাম। বীচের চেয়ার দেখে শুনে রাখার কাজ ওর। দিনে ৫০টাকা করে পায়। মালিকের ডাক শুনে বিদায় নিয়ে দৌড়ে চলে গেল।মন মেজাজ খারাপ ভাব টা ততক্ষনে অনেকটাই কেটে গেছে। বেশিক্ষন রাগ করে থাকা আমার স্বভাবে নেই। এতক্ষন খেয়ালই করি নি,বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে এগোচ্ছে। সূর্য ডোবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

চারিদিকে নীল জল, উপরে নীল আকাশ,একটু গোধূলির লালচে আভা..আমি মুগ্ধ হয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। এক একটা ঢেউ আছড়ে পড়ছে পায়ের কাছে। অথচ কে বলবে, এই একটু সময় আগেও সমুদ্র ছিল অনেক দূরে! ঢেউ এ সব উলটা পালটা হবার আগেই নিরাপদ স্থানে যেতে হবে। পিচ্চি ছেলেটা জানিয়ে গিয়েছিল, সিগন্যাল চলছে! আমি পা বাড়াই। বেশিদূর যেতে পারি না। চারিদিকে বিশাল ঢেউ আর সমুদ্রের গর্জন! রীতিমত আত্মা

কেপে উঠছে! দূরে একটা মানুষের অবয়ব সমুদ্রের এই তাণ্ডবলীলার মাঝে লাফাচ্ছে। কেউ কি বিপদে পড়ল! আমার কি এগিয়ে যাওয়া উচিত। ঝামেলা কাঁধে নিতে ইচ্ছা করছে না, ধুর! সামনের দিকে পা বাড়ালাম। নাহ, মন খুতখুত করছে, গিয়ে দেখি কী অবস্থা! বিশাল বড় বড় ঢেউয়ের বাধা কাটিয়ে যখন অবয়বটার কাছে পৌঁছালাম, গিয়ে দেখি ছেঁড়া দ্বীপের সেই মেয়েটা। আমার চোখ তখন কপালে। পাগল নাকি! এই অবস্থায় কেউ সাগরে নামে! আমি মেয়েটাকে ধরে তীরে নিয়ে এলাম! বেশ কঠিন ধমক লাগালাম, ‘মরবা নাকি?’ মেয়েটা তখনো খুশিতে, উত্তেজনায় লাফাচ্ছে! সব দাঁত বের করে একগাল হাসি দিয়ে বলল, ‘নাহ আপু, মরলে তো সেই ১ বছর আগেই মরে যেতাম!’ আমি ওর কথা তেমন একটা পাত্তা না দিয়ে বসে পড়লাম! হাপাচ্ছি রীতিমত। একটু ধাতস্থ হতেই খেয়াল করলাম, মেয়েটা সেই চঞ্চল বাচ্চাটি আর নেই, একদম ভদ্র হয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। কোথায় থাকে, কী করে,কার সাথে এসেছে এসব প্রশ্ন করে জানা গেল, অদ্রি নামের মেয়েটা দেখতে বাচ্চা বাচ্চা হলেও নেহায়েত বাচ্চা নয়। উচ্চশিক্ষার্থে স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে কিছুদিনের মধ্যেই। তাই এখন ঘুরতে আসা। একাই এসেছে। আজ ঢাকায় ফেরার কথা ছিল আজ। জাহাজ না আসায় আমার মতই আটকা পড়ে গেছে!

আজ পূর্নিমা। মাথার ওপরে বিশাল চাঁদ। আমি আর অদ্রি বসে আছি বিশাল চাঁদ এর নিচে, সামনে উত্তাল সমুদ্র।হঠাত দেখলাম দূর থেকে কেউ একজন আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে, কেমন অদ্ভুতভাবে হেটে আসছে ছায়া টা।  সামনে এসে দাঁড়াতেই  চাঁদের আলোয় চিনতে কোন অসুবিধা হল না! জেটির সেই বেয়াদব ছেলেটা! একটু ঘাবড়েও গিয়েছি। হায় আল্লাহ, আজ আমার কপালে এত্ত ঝামেলা তুমি কোথ থেকে দিচ্ছ!! কতদিনের প্রতিশোধ একদিনে নিচ্ছ?? ছেলেটা বলে উঠল ‘আপু আপনাকে আমি পুরো বীচে খুঁজেছি’। সাথে সাথেই চিৎকার করে উঠলাম, ‘কেন? কথা শুনানোর জন্য?একটা মেয়ে অপমান করে গেল সেটার শোধ তুলতে? আপনার মত বেয়াদবের পক্ষে সব সম্ভব। এখন নিশ্চয়ই একা পেয়ে হেনস্থা করবেন?’ ছেলেটা থতমত খেয়ে গেল। একটা কথাই বলতে পারল,’ আপনি তো একা নন, পাশেই তো আরেকজন মানুষ আছেন!’ আমি অদ্রির দিকে তাকাতেই দেখলাম, সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে! আমি পুরোপুরি না চিনি এই সারল্য ভরা মেয়েটিকে, না চিনি এই বেয়াদব ছেলেটিকে! নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগছে। ছেলেটা ‘বসি ?’ বলেই বসে পড়ল।

অদ্রি এতক্ষনে আমাকে ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করছে, ‘ছেলেটি কে আপু?’ আমি বললাম ‘ চিনি না, খারাপ ছেলে বোধ হয়’। মেয়ে টা আমার কথায় একটু কী ভরকে গেল! পরক্ষনেই দেখলাম সমুদ্রের দিকে ওর বড় বড় দু চোখের পূর্ন দৃষ্টি দিয়ে বলল, ‘পাচ বছরের এতখানি পরিচিত,গায়ের গন্ধ থেকে মুখের রেখা গুলো পর্যন্ত মুখুস্ত  মানুষকে চোখের সামনেই ”আগন্তুক” হয়ে যেতে দেখেছি, তার চেয়ে আর কত খারাপ হতে পারে একজন অপরিচিত মানুষ!’ একটু ধাক্কাই খেলাম। এত হাস্যোজ্জল মেয়েটার হঠাত এই বিষন্ন চেহারা আমি আশা করিনি বোধ হয়।

সমুদ্র ততক্ষনে একটু শান্ত হয়ে এসেছে। এই ভরা পূর্নিমায় সমুদ্রের তীরে তিনজন প্রায় একই বয়সের মানুষ চুপচাপ বসে আছি। কেউ আর কিছুই বলছে না। আমার মন থেকেও বিরক্তি,রাগ,অভিমান সব চলে গিয়ে কেমন ফাকা ফাকা বোধ হচ্ছে! মনে হচ্ছে, জগত সংসারে কারো কেউ নেই, প্রত্যকে একা,কোন বাঁধন নেই, পিছুটান নেই। অনন্তকাল ধরেই আমরা এভাবে বসে আছি মাথার ওপর বিশাল চাঁদ, সামনে সীমাহীন সমুদ্র আর এমন সুনসান নীরবতা নিয়ে!  ওই বেয়াদব ছেলেটাই নীরবতা ভাংলো। ‘আমি রাফিদ, ঘুরতে এসেছি। আজ চলে যাবার কথা ছিল, আটকা পড়ে গেছি। আপনারা?’ আমার  হাসি পেয়ে গেল। সব একই গোয়ালের গরুর দল এক হয়েছে। তিন জনেই এখন নিজ নিজ  গন্তব্যের পথে থাকতাম। আর এখন কিনা বসে আছি এখানে,  এক সমুদ্র জল আর এক আকাশ পূর্নিমা মাথায় করে!

 

টুকটাক পরিচয় পর্ব শেষ করে আমরা গান নিয়ে মেতে উঠলাম। যে যার মত একটা গান ধরে বাকি দুইজন সুর মিলায়। এদিক দিয়ে রাফিদ এগিয়ে। সৃষ্টিকর্তা বোধ হয় আমাকে এবং অদ্রিকে গানের কোন প্রতিভা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান নি। তাও অদ্রির সব লিরিক্স জানা। আবৃত্তিও ভাল করে মেয়েটা,

গল্পে গল্পে শুনলাম এক সময়ের তুখোড় বিতার্কিক! হঠাত গান থামিয়ে রাফিদ বলে উঠল,’ আমি মাঝে মাঝেই সেন্টমার্টিনে আসি। বিশেষ করে পূর্নিমা মিলিয়ে। এসে কিছুই করি না। সমুদ্র কে নিজের সব দু:ক্ষ দিয়ে আবার খুশি মনে ফিরে যাই!’ বলে একগাল হাসি দিয়ে তাকিয়ে আছে! এই অদ্ভুত বেয়াদব ছেলেটাকে খুব একটা খারাপ মনে হচ্ছে না এখন। আবার খুব বেশি বিশ্বাসও করতে পারছি না। অদ্রি একটু আগ্রহ দেখালো, ‘সমুদ্র কি সবার দু:খ নেয়?’ রাফিদ বলল, ‘নিবে না কেন! সমুদ্র একা। সে সবার সব নেয়, কিন্তু নিজের কাছে রাখে না, সব ফিরিয়ে দেয়। হয়ত অন্য কোথাও, অন্য তীরে!’ আমার কথাটা ভালো লাগল! এই সমুদ্রকে কেন যেন আমার কেমন মানুষ মানুষ  মনে হয়! যার জীবন আছে, অনুভূতি আছে আমাদের মতোই। কিন্তু খুব বড় মাপের কেউ, একদম ধরা ছোঁয়ার বাইরের কেউ একজন!

রাফিদ শুরু করল, ‘চলেন আমরা নিজেদের জীবনের একটা করে দু:খ শেয়ার করি। এমন পরিবেশে হয় দু:খের গল্প অথবা ভূতের গল্প মানায়। কী বলেন?’ অদ্রি চিৎকার দিয়ে উঠল,’ না না আমি ভূত খুব ভয় পাই, ভূতের গল্প না প্লিজ!’ আমিও সাপোর্ট দিয়ে বল্লাম, তো বিলিয়ে দেয়া হোক সমুদ্র কে নিজের সব দু:খ।

তিন.

‘সবার জীবনেই নিজস্ব কিছু দু:খ থাকে, নিজের কাছেই নিজের হেরে যাবার একটা গল্প থাকে, কষ্টের গল্প থাকে, প্রচণ্ড লজ্জার, অপমানের,হতাশার আবার হয়ত খুব ভালবাসার! আমরা তা মনে করতেই চাই না! ভুলে থাকি। ভুলে থাকতে হয়!’- অদ্রি শুরু করে, ‘ছোট্টবেলা থেকেই প্রচণ্ড আদরে মানুষ, বাসার সবচেয়ে ছোট। পৃথিবীর যা কিছু ছলনার, ঠকবাজি, মিথ্যা, প্রতারণা কিছুই কখনো স্পর্শ করেনি কখনো। সবাই খুব আগলে রাখত। আমার কাজ ছিল কেবল প্রচুর বই পড়া, ক্লাসের বই, গল্পের বই, কবিতার বই। আর আবৃত্তি,বিতর্ক, সায়েন্স ফেয়ার এসবে মেতে থাকা। স্কুল, কলেজে সবার পরিচিত মুখ। দুষ্টুও খুব ছিলাম। একদম টম বয় টাইপ। এভাবেই কেটে যেত সময়। ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ফেললাম। ভর্তি হলাম ভার্সিটিতে। বাসার বাইরে, ফ্যামিলির বাইরে এই প্রথম। একা চলার দিন শুরু। হোস্টেল লাইফ বুঝতাম না ঠিকমত। সবাইকেই কেমন ভয় ভয় লাগত! তখনো একদম বাচ্চা ছিলাম!’ অদ্রির শেষ লাইন টা শুনে হাসি পেল,মেয়েটা বোধ হয় জানে না, এখনও ও বাচ্চাই আছে! আবার মনযোগ দিলাম,অদ্রি বলছে, ‘আমার একটু নির্ভরতার স্বভাব। একটু আদর,ভালোবাসা পেলেই আমি চোখ বন্ধ করে তাকে ভালোবেসে ফেলি,নির্ভর করে ফেলি তার উপর। আমার হোস্টেলের রুমমেট ছিলেন একজন সিনিয়র আপু। আমাকে এত্ত আদর করত! অনেক ভাল সময় কাটত আমাদের। তখনো যেন একদম বাসার ছোট বাচ্চার মতই দিন কাটছিল। সেকেণ্ড ইয়ার শেষ করে থার্ড ইয়ার এ উঠব। ভালই রেজাল্ট হত তখন।২০১১ সাল। ফেসবুক তখন জনপ্রিয় হচ্ছে, এখনকার মত জনপ্রিয় না অবশ্য! আগে কখনো প্রেম করা তো দূরে থাক, ক্রাশও খাই নি কারো উপর। বরং জিনিসগুলো খুব এড়িয়ে যেতাম। তাই কারো সাথেই কোন কথা হত না ফেসবুকে। একটা আইডি থেকে ক্রমাগত ‘poke” মারত! আমার কলেজ ফ্রেণ্ডের বন্ধু। একদিন খুব বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলাম,’ সমস্যা কি? এত poke মারেন কেন!’ তখনো বুঝতে পারি নি, এই ‘poke’ মারাটাই তার মেয়েদের সাথে কথা শুরু করার একটা কৌশল মাত্র! এই সত্যিটা বুঝতে আমার ৪বছর লেগেছিল! যাই হোক ছেলেটা আমাকে উত্তর দেয়,’ এত রাতে এই জাহান্নামে কি করেন?’ আমিও জিজ্ঞেস করলাম,’ আপনি কি করেন এই জাহান্নামে!’ উত্তর আসে, ‘এই যে আপনাদের মত lil princess দের দেখেশুনে রাখি’! এরপর টুকটাক স্বাভাবিক কথাবার্তা, যেহেতু সে আমার বন্ধুর বন্ধু তাই ভাবলাম টুকটাক প্রশ্নের উত্তর দেয়াই যায়।আমার বন্ধুটি ছিল খুব ভাল ছেলে, ভাল মানুষ। এই ছেলেটাকেও আমি তাই ভেবেছিলাম।

তখন ফেসবুক মেসেঞ্জার,হোয়াটস আ্যাপ,ভাইবার কিছুই ছিল না। ছিল ইয়াহু মেসেঞ্জার। এরপর অনেক কথা হত। ইয়াহু তে কথা হতে হতে রাত ভোর হত। কত কথা। আমি খুব বিড়াল ভালোবাসতাম। ওর ছিল অনেক গুলো বিড়াল। বিড়ালের গল্প শুনে শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে যেতাম। বিড়াল, সাইক্লিং কত কিছু নিয়ে কথা হত। যে বয়সটা মেয়েরা পার করে স্কুলে,কলেজে..ভুল করার সে বয়সটা কিনা আমার ধরা দিল এত বড় হয়ে! ফেসবুক, ইয়াহু তারপর মোবাইল। খুব ঘুমাতে ভালবাসতাম আমি, সারা রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়ে বিখ্যাত শীতের রাত গুলো বারান্দায় কেটে যেত। রুমমেট আপু বকা ঝকা করত, বুঝাত যা করছি তাতে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। তখন আমার মাথায় এসব কিছুই ঢুকে না, আপুকে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলতাম। ভাবতাম, যে ছেলে বিড়াল ভালবাসে সে কখনো খারাপ হয় নাকি! ও আমাকে ঠিক আগলে রাখবে! এর মধ্যে দেখা হল। ওর প্রোপোজের উত্তর চাইলো, ‘না’ বলতে গিয়ে এত মায়া হল যে ‘হ্যা’ বলে দিলাম। আস্তে আস্তে কেমন সব বদলে যেতে লাগল! ওই যা হয় আর কি! যতদিন আমার মুখে ‘না’ শুনেছিল ততদিন আমাকে পাবার চেষ্টা করে গেছিল, একবার পাওয়া হয়ে গেল তো সব আগ্রহ শেষ! আমরা থাকতাম দুই শহরে। ৩০০ কিমি দূরত্বে থেকে আমি শুধু স্বপ্ন দেখতাম। আর ছেলের সব কথা বিশ্বাস করতাম! একদিন আমাদের সব স্বপ্ন পূরন হবে। কিন্তু কোনভাবেই যেন কিছু মিলছে না! ‘৩ মাস আগে  সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি’- বলা ছেলেটার অন্যরূপ চলে আসে আমার চোখের সামনে, সব নাকি মিথ্যা। সিগারেট ছাড়া তো দূরের কথা, রীতিমত নেশাগ্রস্ত ছেলে! আমি আকাশ থেকে পড়ি। যাকে দেখে মনে হয়েছিল, যার সব কথা বিশ্বাস করে পা বাড়ালাম এটা ভেবে যে এই মানুষ আমাকে আগলে রাখবে, আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখবে। এখন দেখি আমি নিজেই তার হাত ধরতে গিয়ে ঝাঁকুনি খাচ্ছি। আমার সাথে দিনের পর দিন ঝগড়া কথা বন্ধ,আমার পৃথিবী তখন শূন্য। কোন বন্ধু নেই, সম্পর্কের শুরুতেই সবাইকে সরিয়ে দিয়েছে আমার পাশ থেকে। রুমমেট আপুও নেই, সবচেয়ে বড় কথা ফ্যামিলির সাথে  ততদিনে বিশাল দূরত্ব হয়ে গেছে। তবু ভাবতাম, সব ঠিক হবে। পাগলের মত কাঁদতাম। আর ও তখন বন্ধু বান্ধবীদের নিয়ে হুল্লোড়ে মেতে থাকত! সারা রাত ঝগড়া হয়েছিল বলে ঢাকায় চলে এসেছিলাম সকাল বেলা ওর রাগ ভাঙাতে। আমি ঢাকায় এসে বান্ধবীদের হোস্টেল,সাবলেট বাসায় ফ্লোরিং করে থাকতাম শুধু ওর সাথে একটু ভাল সময় কাটানোর জন্য। ও তখনো স্টুডেন্ট, হাতে টাকা থাকতো না, তাই কখনো প্রেসার দিতাম না আমার সাথে দেখা করতে যাবার জন্য। ওর খারাপ সময়ে সব সময়ে পাশে থাকতাম। বিশ্বাস করতাম যে, যত যাই হোক আমি শক্ত করে ওর হাত ধরে থাকব, ওর মন খারাপের দিনে আমার বুকে শক্ত করে ওর মাথাটা ধরে থাকব, এটাই তো ভালবাসা! কিন্তু আমার কোন খারাপ সময়ে কখনো ওকে পাশে পাইনি।পরীক্ষার সময়ে সাহস দেয়া তো দূরের কথা একটু ভাল ভাবে কথাও বলত না। এর মধ্যে জানলাম, আমার আগে তার অন্য প্রেমিকার কথা! খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। একদম টিন এজ প্রেমের মত ভালবাসতাম কিনা! তাই আবেগ গুলোও বেশি ছিল। তবু ভাবতাম, মানুষ টা এখন তো আমার। আগে যাই হোক।এরপর তো আর কেউ আসবে না! ৪ বছর পর রীতিমত অবাক হয়ে জানতে পারলাম, এখনো তার সাথে অন্য অনেক মেয়েদের সম্পর্ক, নিজে কে সিংগেল শো করে ফ্লার্টিং চলে ফেসবুকে, মেসেঞ্জারে। তাহলে আমি কে?? প্রচণ্ড দু:খ পেয়ে সরে আসলাম। কয়েক মাস পর সে এবার এল। অনেক অনুনয়, বিনয়। ক্ষমা চাইল। ক্ষমা করলাম। আমার ‘প্রথম ভালোবাসা’ বলে কথা!

ততদিনে আমার ভার্সিটির পাঠ চুকে গেছে, আমরা তখন এক শহরে। ভাবলাম, এই বুঝি আমার স্বপ্নের সেই ভালবাসার শুরু! এই বুঝি আমাদের ভালো থাকার শুরু। প্রথম দিকে যেমন ও বলত, ‘আমাদের হেভনলি কানেকশন’! কিন্তু কেমন যেন আমাকে এড়িয়ে চলছে! এত সাধনার পর আমাদের একসাথে থাকা অথচ কোন কারন ছাড়াই আমাকে গালাগাল, ঝগড়া, ‘সেল্ফ ডিফেন্স’ এর নামে আমাকে পশুর মত পিটানো এবং দুই দিন পর পর উধাও! বিশ বাইশ দিন পর এসে একদম নরমাল! আমিও সব ভুলে যেতাম। আস্তে আস্তে যেন একটু একটু সব পরিস্কার হচ্ছে, শুনলাম ওর আগের রিলেশন টা ভোলার জন্য আমাকে কেবল খেলার গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছে, কখনো ভালবাসে নি। আমি কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলাতাম। সবাই বলত, ওর অন্য কোন অপশন আছে। কেউ কেউ কত রকম প্রমানও বের করে ফেলল। কিন্তু আমার একটাই কথা, অসম্ভব। আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ও ভালোই বাসতে পারে না। আমাদের এত বছরের সম্পর্ককে ও কিভাবে অপমান করবে! হয়ত কার সাথে ফেসবুকে ফ্লার্টিং করতে পারে কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আমি ছাড়া ও কাউকেই ভালবাসে না!- বোকার মত এমন অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে বসে থাকতাম দিনের পর দিন। আমি হয়ত তখনো জানতাম না আরো কি ভয়ংকর সত্য অপেক্ষা করছে!

ওর মোবাইলে যেদিন মেয়েটার কন্ঠস্বর শুনলাম,মেয়েটার ওকে বলা কথাগুলো শুনলাম আমার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছিল। আমার সারা শরীর ঘেন্নায় রি রি করে উঠল! যাকে আমি কেবল প্রেমিক ভাবিনি,জীবন সংগী ভেবেছি সে আমাকে ঠকাল!! আমার সাথে সম্পর্ক থাকা অবস্থায় অন্য মেয়ের কাছে গেল! আমি এতদিন যেটাকে ঘর ভেবে দাঁড়িয়ে আছি সে ঘরে অন্য কেউ! কী অবলীলায় দিনের পর দিন আমাকে মিথ্যা বলেছে, মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়েছে, আমাকে শারীরিক,  মানসিক অত্যাচার করেছে,আমার চরিত্রের মিথ্যা দোষ খুজে বেড়িয়েছে নিজের নোংরামি ঢাকতে!!আমার কাছ  থেকে মোবাইল নিয়ে যেত যাতে কেউ আমার সাথে যোগাযোগ না করতে পারে। অথচ সেই মেয়ের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে গেছে দিনের পর দিন। রাত ১১টায় আমাকে মাঝ রাস্তায় দাঁড় করিয়ে চলে গেছে অবলীলায়!’

অদ্রি একটু থামল। আমি অবাক হয়ে মেয়েটাকে দেখলাম। কিভাবে এমন দুই নাম্বার একটা ছেলের সাথে ও পাচ বছর নষ্ট করল! কী অদ্ভুত। এমন নিষ্পাপ আবেগ,লাগামছাড়া ভালোবাসা কিনা বিলিয়ে দিল  পশুর চেয়েও জঘন্য এক ভণ্ড প্রতারক কে! যে কিনা সস্তা আবেগ খুঁজে বেড়ায়,যার কিনা সাময়িক চাহিদা পূরনের জন্য কাউকে দরকার,নিখাদ প্রেমের মূল্য সে দিবে কি করে! সম্পর্ক এর দীর্ঘায়ু সে চাইবে কী করে! বোকা মেয়ে, বানরের গলায় মুক্তোর মালা কি শোভা পায়!

রাফিদ বলে, ‘তারপর? ‘

‘তারপর? তারপর কেটে গেল সহস্র রজনী!! ঘৃনায় মুখ ফিরিয়ে নিলাম। কেবল অবাক হলাম কী করে একটা মানুষ নিজের দেখানো মিথ্যা স্বপ্ন দিয়ে একজন কে প্রতারিত করে অন্যের হাত ধরতে যায়,নিজের প্রেমিকাকে কাদিয়ে অন্যের মায়া কান্নায় সুর মেলাতে যায়! সেই একি poke মারা, ফ্লার্টিং, ফোন, মেসেঞ্জার, আবার সেই চক্রে ঢুকে পড়ে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ ছাড়াই!

আমার শুরু হল এক অদ্ভুত জীবন। যে মানুষ টা বলত, ‘তুমি অন্ধকার পৃথিবী চেন না, তাই সবাইকেই বিশ্বাস করো’ সে মানুষ টাই যেন নিজের কাজ দিয়ে অন্ধকার পৃথিবী আর নিজে কে চিনিয়ে গেল। আমি রাতে ঘুমাতে পারতাম না। টানা এক মাস আমি রাতের পর রাত বসে কাটিয়েছি। এক মমুহূর্তের জন্যেও চোখের পাতা এএক করতে পারি নি। একটু ঘুমালেই ভয়ংকর সব দু:স্বপ্ন দেখতাম। আগে দু:স্বপ্ন দেখলেই আমি ওকে সাথে সাথে কল দিতাম! আর এখন আমি চুপচাপ সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থাকি!  চিৎকার করে সারাদিন কাঁদতাম, একা একা সারাদিন ওর সাথে কথা বলতাম, ওই মুখ, কন্ঠস্বর ডাইনীর মত তাড়া করত আমাকে।

বাইরের একটা ছেলের জন্য নিজের যে  ফ্যামিলির সাথে এত বছর দূরত্বের দেয়াল বানিয়েছিলাম তারাই আমার ভয়ংকর দু:সময়ে পাশে এসে দাঁড়াল। আমি রাস্তায় বের হতে ভয় পেতাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতাম না। কারো সাথে কথা বলতাম না, মোবাইল ধরতাম না। তিন মাস আমি সূর্যের আলো দেখি নি। ৩০০ মাইল দূরে বসে যে প্রেম আমি লালন করলাম এতগুলো বছর, আজ হাতের নাগালের দূরত্বে থেকেও সে অন্য কাউকে নিয়ে মেতে আছে! কিছুতেই মানতে পারতাম না, কিভাবে পারল আমাকে ঠকাতে! ডক্টর-কাউন্সেলিং,ওষুধ এসব নিয়েই দিন গুলো কাটছিল। একের এর পর এক চরম মূল্য দিতে হচ্ছিল আমাকে। আমি কোর্স আউট হলাম, জীবন-ক্যারিয়ার সব শেষ হয়ে যাচ্ছিল।

৬ মাস এমন স্বেচ্ছা নির্বাসনের পরর একদিন মা’ এর কান্না আমাকে নাড়িয়ে দিল! ঠিক তো! অন্যের অপরাধে তাদের কেন কষ্ট দিচ্ছি আমি? যার প্রতারনার শিকার হয়ে আমি নিশ্চিহ্ন হতে বসছিলাম সে তো দিব্যি নতুন মানুষ নিয়ে আনন্দে আছে !আস্তে  আস্তে বুঝলাম, এই পাঁচটা বছরে আমাকে কখনো ভালই বাসে নি সে! সততা ছিল না ওর মধ্যে।কেবল নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। আমি প্রথম ‘একা’ বের হলাম রাস্তায়। পিএইচডি’র পেপারস সাবমিট করলাম নতুন করে।দৌড়াদৌড়ি করতে হল। বাইরে পিএইচডি এর জন্য এপ্লাই করতে লাগলাম।  আবার নতুন করে শুরু করাটা সহজ ছিল না একদমই। রাস্তায় সবার মধ্যে, সবকিছুর মধ্যে আমি কেবল অনুপ্রেরনা খুঁজতাম, নতুন ভাবে বেচে থাকার একটু অর্থ খুঁজতাম। ৬ মাসের মাথায় কানাডা তে একটা ফুল স্কলারশিপও পেয়ে গেলাম। আমার রেজাল্ট ভাল ছিল। ডিপার্টমেন্ট এ টপ ছিলাম তাই রিকমেন্ডশন পেতেও কষ্ট হল না। এখন আমি একা চলতে শিখে গেছি। এই সেন্টমার্টিনে আমাদের একসাথে আসার কথা ছিল। ভুল মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম, ভুল মানুষ হয়ত স্বপ্ন দেখিয়েছিল কিন্তু ৫ বছর স্বপ্ন গুলো ভালবাসতে ভালবাসতে স্বপ্ন গুলোকে আর ভুল ভাবতে পারি না! তাই একাই চলে এলাম। ও আমার জীবনের এক চরম অপমান, লজ্জা আর যন্ত্রনার অধ্যায়। সেখানে কেবল মিথ্যা, অসততা আর প্রতারনা ছাড়া আর কিছু পাইনি আমি।সেটা ছুড়ে ফেলতেই সমুদ্রকে উজাড় করে দিলাম।’

এমন পূর্নিমার আলোতে, সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে মানুষ বোধ হয় শিশু হয়ে যায়। তীব্র আকুল নয়নে অদ্রি কেঁদেই চলেছে।  আহারে, মেয়েটা এত ভালবেসে, নিষ্পাপ আবেগ, বিশ্বাস দিয়ে, এত্ত স্যাক্রিফাইস কম্প্রোমাইজ করে কেবল মিথ্যাই পেল। এমন প্রানোজ্জ্বল মেয়ের ভিতরেও এমন কষ্ট লুকিয়ে আছে সেটা বোঝার সাধ্য কারো নেই। ছেলেটা কি আসলেই সুখে আছে? এত সোজা! কোন কোন মাঝ রাতে তার চোখেও বোধ হয় অদ্রির নিষ্পাপ শিশুসুলভ মুখটা ভেসে ওঠে, অদ্রির দুষ্টুমি ভরা মায়া মায়া চোখের দৃষ্টি মনে পড়ে যায়। তীব্র ভালবাসার কথা ভেবে বুকে কয়েক মুহূর্তের জন্য হাহাকার ওঠে। অথবা হয়ত কিছুই নয়। ছেলে বরাবরের মত মাঝ রাত্তিরে অন্য কারো সাথে ব্যস্ত, মোবাইলে, ফেসবুকে। পাঁচটা বছরেও অদ্রিকে পাশে পেয়েও বোঝার মত ক্ষমতাই যে ছেলের থাকে না সে এখন সব ভুল বুঝে কষ্ট পাবে সে আশা করাটাই বোকামি।এসব ছেলে তো একা থাকার সাহস টা নিয়েও জন্মায় না। সাময়িক চাহিদা কেবল তাদের তাড়িত করে একজন থেকে অন্য জনের দিকে। এদের ‘খুঁজতে থাকা’ স্বভাব কখনো শেষ হয় না। অদ্রির মত বোকা রাই কেবল এদের দেখানো স্বপ্ন গুলোকে ধর্মীয় গ্রন্থের মত বিশ্বাস করে যায় আর শেষ অব্দি আঁকড়ে ধরে চেষ্টা করে স্বপ্ন গুলোকে বাঁচানোর!

চার.

নীরবতা ভেংগে রাফিদ শুরু করে, ‘ আমি ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে। ছোট বেলায় আমি খুব ভাল স্মৃতি নিয়ে বড় হই নি। কেবল মনে আছে, আমি নানুর কাছে বড় হয়েছি। নানুই আমার সব দেখাশোনা করতেন। আমার মা কে দেখতাম কেবল মন খারাপ করে বসে থাকতে। তখন খুব জেদ চাপত। আর সবার মত আমার মা কেন আমাকে আদর করে না, আমার বাবা কেন আমার খোজ নেয় না! স্কুলে বন্ধু দের সাথে মিশতে পারতাম না, ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে বলে সবাই একটু এড়িয়েই চলত। পড়াশোনা করতেও ভাল লাগত না। বলা যায় অনেকটা ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিলাম।

আমার বাবা মা দুজনেই সরকারের বেশ বড় আমলা বেশ! টাকা ছিল তাদের। সে সূত্রে আমারও। কিন্তু আমি ঘরে কখনো শান্তি পেতাম না! খুব ঘুরতে ভালোবাসতাম। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে চলে যেতাম। পাহাড় খুব টানত। ট্রেকিং এর নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল। যতদিন বাসার বাইরে থাকতাম, খুব ভাল লাগত। বাসায় আসলেই সেই চিরাচরিত হতাশা। নানুরও এখন বয়স হয়েছে। মা বাবা দুজনেই আলাদা আলাদা সংসারে সুখে আছে। কেবল আমিই যেন কেমন গোত্র ছাড়া! কোথাও কোন শক্ত মাটি পাই না দাঁড়াবার। আবার মনের দু:খে পাহাড়ে পাহাড়ে ছোটো! পায়ের তলায় তবু তো কিছু শক্ত মাটির স্পর্শ পাওয়া যায়! কিন্তু আমার এই ট্রেকিং এর নেশা মা বাবা কেউ পছন্দ করত না। তাই জেদের বশে তাদের বিরুদ্ধে গিয়েই ঘুরতাম। যারা আমাকে একটা সুন্দর শৈশব দিতে পারে নি, আমার প্রিয় জিনিসে তাদের নাক গলানোও আমার সহ্য হত না।

ভালোই কাটছিল সেই ট্রেকিং এর দিন গুলি। এক সময় সিদ্ধান্ত নিলাম, একটা ট্রাভেল গ্রুপের সাথে এক্সপেডিশনে যাব! এভারেস্টের স্বপ্ন আমার দুই চোখে! ইন্ডিয়াতে ‘হিমালয়ান ইন্সটিটিউট অফ মাউন্টেইনারিং’ এ আমরা এক মাস ট্রেনিং নেই। এরপর দেশে ফিরে আসি স্পন্সর যোগাড় করতে। তিন মাস অনেক  কষ্টের পর একদিন স্পন্সরও পেয়ে গেলাম। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। অবশেষে আসে সেই দিন, আমি রওনা দেই। নেপাল পৌঁছানোর পরর একদিন থেকে পরদিন কাঠমুন্ডুতে গিয়ে একটা বিদেশি টীমের সাথে যোগ দেই। আগেই ঠিক করা ছিল। আমরা মোট ১৫জনের টীম। চরম উত্তেজনা নিয়ে আমরা শুরু করলাম আমাদের যাত্রা।’

রাফিদ থামতেই, আমি আর অদ্রি একসাথে লাফিয়ে উঠলাম, ‘তারপর?’ অ্যাডভেঞ্চার এর গল্পে  তখন আমরা মুগ্ধ। এই ছেলেকে নিশ্চয়ই  বিনা শর্তে ক্ষমা  করা যায়, ভেবে একটু হাসি পেল আমার!

রাফিদ আবার শুরু করল, ‘তারপর ৫ দিন আমরা বেশ ভালো ভাবেই এগোতে থাকলাম। চারপাশের মুগ্ধতা দেখতে দেখতে মনে হত, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ! কিন্তু সুখ আমার কপালে বোধ হয় রাখেন নি উপরআলা! ৬ দিনের মাথায় শুরু হল বাজে আবহাওয়া, তুষার ঝর, বাতাস। মুহূর্তের মধ্যেই সব আমাদের প্রতিকূলে চলে গেল। ৮ জন সিদ্ধান্ত নিল ফিরে যাবার। ৪জন সিদ্ধান্ত নিল আপাতত যাত্রা বন্ধ রাখার।  আমার এতদিনের স্বপ্ন ফেলে আমি কিছুতেই শুধু শুধু  বসে থাকার সিদ্ধান্তে শান্তি পেলাম না। আমরা বাকি তিন জন চলতে শুরু করলাম।

৪ ঘন্টা প্রচন্ড কষ্টে চলার পর শুরু হল বাতাস আর তুষার ঝড়। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম তাবু খাটাবার। কিছুক্ষন পড়েই, আমার তাবুর ওপর হঠাত তুষার ধস শুরু হয়! আর কিছু মনে নেই তখন। দেড় দিন পর আমার যখন আমার জ্ঞান ফিরে  আমি ডান পায়ে কোন নার্ভ সেন্সেশান পাচ্ছিলাম না! কোন অনুভূতি নেই। ভাবলাম বরফ চাপা থাকায় এ অবস্থা। তখনো বুঝিনি এটাকেই ‘ফ্রস্ট বাইট’ বলে।  ২দিন পর রেস্কিউ টীম এসে আমাকে উদ্ধার করে। হসস্পিটালে নেয়া হয়। আমাকে বাচানোই তখন মুষ্কিল। বেচে গেলাম ঠিকই কিন্তু ডান পা টা কেটে বাদ দিতে হল!

আমার এ পা-টা আসল পা না, নকল পা! ওই যে বললাম, আমার বাবা-মা এর ভালোই টাকা আছে। আমার বাবা এই প্রথম আমাকে একটা গিফট করলেন, একটা নকল পা!  তবু আমি চাইলেই এখন আর দৌড়ে পাহাড় ডিঙাতে পারি না। বেশিক্ষন হাটলেই হাফ ধরে যায়। তাই আমি মাঝে মাঝেই সমুদ্রে আসি। দুই একদিন সময় কাটাই তারপর ফিরে যাই!’

এক নি:শ্বাসে কথা গুলো বলে রাফিদ থামল। আমি কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। অদ্রিও চুপ। পাথরের মূর্তির মত বসে আছি। সমুদ্র, ঢেউ, গর্জন, পূর্নিমা কিছুই যেন ছুতে পারছে না কাউকে।

রাফিদ আমার দিকে তাকিয়ে  বলল, ‘জেটিতে আমি হেসেছিলাম বলে কিছু মনে করবেন না। আসলে আপনার ঢাকায় ফেরার তাড়া দেখে আমার মনে পড়ল আমি কোথাও ফেরার তাড়া নেই, তাড়া থাকলেও এভাবে দৌড়াদৌড়ি করবার উপায় নেই।এজন্যেই এক কোনায় দাঁড়িয়ে  মুচকি হাসছিলাম। আপনি রেগে গেলেন,আমার ভুল বুঝতে পেরে আপনাকে স্যরি বলার জন্য আপনার পিছন পিছন হাটা শুরু করলাম।কিন্তু এই পা নিয়ে কি আর আমি আপনার নাগাল পাই! অবশেষে পেলাম আপনাদের!’

 

হায়, জীবন কত টা নিষ্ঠুর। কত ভাবেই কত কিছু শিখিয়ে দিয়ে যায়। মরতে মরতে কী করে বাঁচা যায়, সেটা যেমন শিখায় আবার অবলীলায় দুর্দান্ত বাঁচতে থাকা মানুষ টার জন্যে নিয়ে আসে মরনসম যন্ত্রনা!

ভোরের আলো ফুটবে কিছুক্ষনের মধ্যেই। সমুদ্রও ফিরে গেছে অনেকটা দূরে, যেন সারা রাত ধরে সবার দু:খ নিজের বুকে নিয়ে লুকিয়ে ফেলেছে। রাফিদ দূরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের ঢেউ গুনছে। । অদ্রি গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে কাঁদতে কাঁদতে। নিশ্চয়ই মুখ ভর্তি হাসি নিয়ে সকালে জেগে উঠবে।

আমার হাতের যন্ত্রনা টা বেড়েছে। বার্ন ক্রিম লাগানোর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, সাথেও নেই। কখন ফার্মেসি খুলবে কে জানে! এখানকার ফার্মেসিতে বার্নক্রিম পাওয়া যাবে তো!

হায়,  বার্ন-ক্রিমেই কী আর সব যন্ত্রনা মুছে ফেলা  যায়!!

লিখেছেনঃ ডা: মাহফুজা লুনা