বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের মহানায়ক (পর্বঃ২)

আতাউল হাকিম আরিফঃ ছয়দফা দাবী ছিলো তার দূরবর্তী লক্ষ্যে অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা।খুব দৃঢ়ভাবে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁর লক্ষ্যের দিকে-বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মাঝে খুব তাড়াতাড়ি সঞ্চারিত করেছিলেন অধিকার আদায় ও মুক্তির দাবি।বারবার জেলে পুরেও পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে ক্ষান্ত করতে পারেনি-ততদিনে বঙ্গবন্ধু বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন, ছাত্রদের ১১ দফা দাবীর মধ্য ৬৯’র গণ অভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচনের সফলতার বঙ্গবন্ধু তথা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ চূড়ান্ত সফলতার দিকে হাঁটছিলেন-৭০’র নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা না দেওয়ার চক্রান্ত এবং ৭ মার্চের ভাষণ এবং মুক্তিযুদ্ধ পুরো অধ্যায়ে একজন শেখ মুজিব স্পুলিঙ্গের জ্বলছিলেন বাঙালির চূড়ান্ত মুক্তির চেতনায়।৭ই মার্চের ভাষণ ছিলো বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও অলিখিত ভাষণ।এটি ছিল এক অমর বানী-বাঙালির শ্রেষ্ঠ কবিতার পংক্তি, কেননা ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক সে ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বর্জ্রকণ্ঠ এবং স্বাধীনতার ঘোষণা চুম্বকের মতো আকর্ষণ করল প্রতিটি বাঙালির হৃদয়, সে মন্ত্রেই ঝাপিয়ে পড়ল মুক্তিযুদ্ধে।যেটি পরবর্তীতে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করছে।শেখ মুজিব খুব ভালোভাবেই জানতেন এদেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁকে হয়তো জীবনও দিতে হতেপারে-
দেশদ্রোহিতার মামলায় তাঁকে যেকোনোদিন মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখিও হইতে হতে পারে- তিনি যে সত্যিকার অর্থেই নেতা-এদেশের মানুষকে ভালবেসে জীবন উৎসর্গ মন্ত্রেই যে তিনি এসেছিলেন ধরণীতে।নিজের জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করেই তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছেন, বিশ্ব দরবারে বাঙালিকে আত্বপরিচয়ের ঝাণ্ডা তুলে দিয়েছিলেন- স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে। একজন শেখ মুজিবর রহমানের জন্ম হয়েছিল বলেই পৃথিবীর বুকে একটি সতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়।বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই ধাপে ধাপে সংগ্রামের পথ ধরে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এদেশের স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছে-বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের দৃঢ়তায়, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে ভালবেসে বাঙালি তাঁদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলো।এইকথাও স্বীকৃত যে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ভূখণ্ডকে বঙ্গবন্ধু পূর্বেই বাংলাদেশ নামে ঘোষণা দিয়েছিল।কেননা এই বাংলাদেশই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের মধ্যেই প্রোথিত ছিলো। একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের পরিচয় থেকে ধর্ম নিরেপক্ষ জাতিসত্ত্বার পরিচয় বঙ্গবন্ধু তার অপার মহিমায় তরান্বিত করেছিলেন।তাতেই বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে দৃঢ়চেতায় এবং উন্নত মূল্যবোধ লালনের মধ্য দিয়ে।বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন শব্দে রূপলাভ করেছে তাইতো বাঙালির শ্লোগান হয়ে উঠেছে “তোমার দেশ আমার দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ”।
দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানতেন অনেক প্রতিবন্ধকতা আসবেই,স্বাধীনতা বিরোধীদের ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ নিয়ে সামনের দিকে চলছিলেন,সেই লক্ষ্যে আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পাশাপাশি শোষিতের গণতন্ত্রের ধারণার উপর এগোচ্ছিলেন পাশাপাশি শোষণ মুক্তির লক্ষে সমাজতন্ত্রের ধারণার সমর্থন আদায় এবং বাঙালির আজন্ম লালিত ধর্ম নিরেপক্ষতার বিকাশেও তিনি কাজ করছিলেন যা পূর্বে কেউ করেনি। আমাদের দূর্ভার্গ্য যে সেইসময়টুকু আমরা তাঁকে দিইনি, যখনি তিনি তাঁর সার্বিক ধ্যান ধারণা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে দুর্নিবার এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখনি ১৯৭৫, ১৫ই আগষ্ট ইতিহাসের সবচাইতে নির্মম অধ্যায়টি রচিত হলো।স্বপরিবারে হত্যা করা হলো পিতা মুজিবকে।এবং এর মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হলো স্বাধীনতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী দেশের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় ছিল।বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে শুধুমাত্র একটি রাষ্ট্রের জন্মদাতাকে নয়,একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের অপচেষ্টা চালিয়েছে তারা।অনেকাংশেই সফল বলা চলে,পুরোপুরি নয়,অনেকাংশে বলার অর্থ প্রায় তিন দশক পরে হলেও বাঙালি জাতিকে পুনরায় একটি শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তারই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।নিশ্চিতভাবে বলা যায় ১৯৭৫-১৫ আগষ্ট সংগঠিত হয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে-এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী যেমন দায়ী তেমনি অস্বীকার করার উপায় নেই এর সহযোগী একটি অংশ ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ।একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার পাক্কালে এদের মধ্যে র‍্যাডিক্যাল চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটে,মূলত কোন ধরণের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিলো তা অনুধাবণে ব্যার্থ হয়ে পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে এই অংশটি প্ররোচিত হয়েছিল!বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলে শ্রেণি সংগ্রামের নামে তারা তৎকালীন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বচিত সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে ব্যাংক ডাকাতি, টাকা লুট,রেললাইন উপড়ে ফেলে-এমনকি সেইসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতেও সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিলো,হত্যা করেছিল হাজার হাজার আওয়ামীলীগ সমর্থিত নেতা কর্মিদের।তারা বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনা করে স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে।সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার মধ্য দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অবনতি ঘটে আইনশৃঙ্খলার।সামরিক বাহিনীর একটি অংশ তাঁদের অনুসারী হওয়ায় খুব সহজেই হত্যাকাণ্ড তরান্বিত করতে সক্ষম হয়।শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি খুনীচক্র বিচারের পথ রুদ্ধ করতে জারি করে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ।